সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৮ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি,সেপ্টেম্বরে ব্যাংক আমানত প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছাল

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৭:৪০:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১১৮ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও আমানত বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানত প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ—যা গত ১৮ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। এর ঠিক আগের মাস আগস্টে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ০২ শতাংশ, যা ছিল গত ১৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অর্জন। ফলে টানা দুই মাস ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধির এই প্রবণতা অর্থনীতিতে আস্থা ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রকাশিত আমানত সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত টানা ১৩ মাস আমানতের প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশের নিচে অবস্থান করেছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে এটি ৯ দশমিক ২৫ শতাংশে উঠলেও তখনও তা স্থিতিশীল ছিল না। তবে আগস্ট থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে, যার ধারাবাহিকতা সেপ্টেম্বরে বজায় রয়েছে।

অর্থনীতিতে আস্থার পুনরুদ্ধার?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি আগস্টের তুলনায় সামান্য কম, তবে ধারাবাহিক দুই মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন—
“গত ১৬ মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরের আমানত প্রবৃদ্ধি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, যা সংকটকাল অতিক্রম করে ব্যাংকিং খাতের পুনরুদ্ধারকে প্রতিফলিত করছে।”

ব্যাংকারদের মতে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে—

১. সুদের হার পজিটিভ হওয়া

বর্তমানে ব্যাংক আমানতের সুদের হার রয়েছে ৮.৫% থেকে ৯.৫% এর মধ্যে।
সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৬%।

এর ফলে প্রকৃত সুদের হার পজিটিভ থাকে, যা গ্রাহকদের আবার ব্যাংকে আমানত রাখতে উৎসাহিত করে।

২. টি-বিল বন্ডের সুদের হার কমে যাওয়া

সেপ্টেম্বর থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার কমতে শুরু করে।
ফলে প্রতিষ্ঠানিক আমানতকারী এবং বড় বিনিয়োগকারীরা বিল–বন্ড থেকে সরে এসে ব্যাংকে টাকা রাখা শুরু করেন।

/> এতে ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবাহ বেড়েছে।

৩. অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরছে

গত বছরের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর কিছু ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়।
এতে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে সেই সময় কিছু ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার ফলে সেই ব্যাংকগুলোতেও আমানত ফিরে আসছে।

ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, হাতে নগদ কমছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—

  • ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে মোট ব্যাংক আমানত: ১৯ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে মোট ব্যাংক আমানত: ১৭ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা

অর্থাৎ এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি

অন্যদিকে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমেছে।

  • ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর: ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর: ২ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা

এক বছরে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ কমেছে হাজার ৮২৯ কোটি টাকা

এটি ইঙ্গিত করে যে মানুষ আবারও ব্যাংক ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও লাভজনক মনে করে সেখানে অর্থ জমা দিচ্ছে।

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, আমানত বৃদ্ধির ফলে—

  • ব্যাংকে তারল্য সংকট কমবে
  • ঋণ বিতরণে গতি আসবে
  • ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অর্থায়ন সহজ হবে
  • সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে

তবে তারা সতর্ক করে বলেন, এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে ব্যাংকিং খাতকে স্বচ্ছতা, ভালো শাসন, সুশাসন ও গ্রাহকের আস্থার জায়গা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

১৮ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি,সেপ্টেম্বরে ব্যাংক আমানত প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছাল

Update Time : ০৭:৪০:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও আমানত বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানত প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ—যা গত ১৮ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। এর ঠিক আগের মাস আগস্টে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ০২ শতাংশ, যা ছিল গত ১৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অর্জন। ফলে টানা দুই মাস ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধির এই প্রবণতা অর্থনীতিতে আস্থা ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রকাশিত আমানত সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত টানা ১৩ মাস আমানতের প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশের নিচে অবস্থান করেছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে এটি ৯ দশমিক ২৫ শতাংশে উঠলেও তখনও তা স্থিতিশীল ছিল না। তবে আগস্ট থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে, যার ধারাবাহিকতা সেপ্টেম্বরে বজায় রয়েছে।

অর্থনীতিতে আস্থার পুনরুদ্ধার?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি আগস্টের তুলনায় সামান্য কম, তবে ধারাবাহিক দুই মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন—
“গত ১৬ মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরের আমানত প্রবৃদ্ধি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, যা সংকটকাল অতিক্রম করে ব্যাংকিং খাতের পুনরুদ্ধারকে প্রতিফলিত করছে।”

ব্যাংকারদের মতে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে—

১. সুদের হার পজিটিভ হওয়া

বর্তমানে ব্যাংক আমানতের সুদের হার রয়েছে ৮.৫% থেকে ৯.৫% এর মধ্যে।
সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৬%।

এর ফলে প্রকৃত সুদের হার পজিটিভ থাকে, যা গ্রাহকদের আবার ব্যাংকে আমানত রাখতে উৎসাহিত করে।

২. টি-বিল বন্ডের সুদের হার কমে যাওয়া

সেপ্টেম্বর থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার কমতে শুরু করে।
ফলে প্রতিষ্ঠানিক আমানতকারী এবং বড় বিনিয়োগকারীরা বিল–বন্ড থেকে সরে এসে ব্যাংকে টাকা রাখা শুরু করেন।

/> এতে ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবাহ বেড়েছে।

৩. অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরছে

গত বছরের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর কিছু ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়।
এতে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে সেই সময় কিছু ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার ফলে সেই ব্যাংকগুলোতেও আমানত ফিরে আসছে।

ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, হাতে নগদ কমছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—

  • ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে মোট ব্যাংক আমানত: ১৯ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে মোট ব্যাংক আমানত: ১৭ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা

অর্থাৎ এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি

অন্যদিকে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমেছে।

  • ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর: ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর: ২ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা

এক বছরে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ কমেছে হাজার ৮২৯ কোটি টাকা

এটি ইঙ্গিত করে যে মানুষ আবারও ব্যাংক ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও লাভজনক মনে করে সেখানে অর্থ জমা দিচ্ছে।

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, আমানত বৃদ্ধির ফলে—

  • ব্যাংকে তারল্য সংকট কমবে
  • ঋণ বিতরণে গতি আসবে
  • ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অর্থায়ন সহজ হবে
  • সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে

তবে তারা সতর্ক করে বলেন, এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে ব্যাংকিং খাতকে স্বচ্ছতা, ভালো শাসন, সুশাসন ও গ্রাহকের আস্থার জায়গা আরও শক্তিশালী করতে হবে।