আগামী মার্চের আগে পাঠ্যবই পাবে না এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী: এনসিটিবির গাফিলতি
- Update Time : ০৮:০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৬৩ Time View

আগামী মার্চের আগে পাঠ্যবই পাবে না এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী: এনসিটিবির গাফিলতি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে বিপর্যস্ত পাঠ্যবই মুদ্রণ প্রক্রিয়া
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র দেড় মাস আগে এসে শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পক্ষ থেকে বছরজুড়ে প্রস্তুতির আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট প্রায় সাড়ে ৩০ কোটি পাঠ্যবই মুদ্রণের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত নবম শ্রেণির মাত্র ২০ লাখ বই ছাপা হয়েছে। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির জন্য নির্ধারিত সাড়ে ১৪ কোটি বইয়ের ছাপার কাজ এখনো শুরুই হয়নি। ফলে আগামী মার্চ মাসের আগে, অর্থাৎ শিক্ষাবর্ষের দুই মাস পার হয়ে গেলেও এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী বইহীন অবস্থায় পড়াশোনা শুরু করতে বাধ্য হবে।
টেন্ডার জটিলতা ও দোষারোপের খেলায় এনসিটিবি ও মন্ত্রণালয়
বছরের শুরুতে সময়সূচি অনুযায়ী বই বিতরণের লক্ষ্যে এনসিটিবি এপ্রিল থেকেই প্রস্তুতি নেয়। মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং অক্টোবরের মধ্যে ছাপা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এসে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটি ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ক্রয়াদেশে অনুমোদন না দেওয়ায় টেন্ডার বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে নতুন করে দরপত্র আহ্বান ও পুনঃটেন্ডার প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছে প্রায় আড়াই মাস।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা দেরির দায় চাপাচ্ছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর। তাদের দাবি, মন্ত্রণালয় যথাসময়ে ক্রয়াদেশ অনুমোদন দেয়নি। অন্যদিকে ছাপাখানার মালিকরা বলছেন, এনসিটিবির অদক্ষতা, গাফিলতি ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
সিন্ডিকেটের প্রভাব ও নিম্নমানের কাগজের বই
তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের প্রতি ফর্মায় সরকারের বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ টাকা ১৫ পয়সা, যেখানে বাজারমূল্যে ন্যূনতম খরচ ২ টাকা ৪০ পয়সা। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী ছাপাখানা মালিক সিন্ডিকেট করে ১
অভিযোগ রয়েছে, আনন্দ প্রিন্টার্সের মালিক রব্বানী জব্বার ও মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. কবির এই সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন। তাদের নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানোর বিষয়টি ইতিমধ্যেই ল্যাব টেস্ট ও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই দুই প্রতিষ্ঠানের হাতে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির মোট বইয়ের অর্ধেকের বেশি কাজ দেওয়া হয়েছে।
বই মুদ্রণে ভয়াবহ বিলম্বের বাস্তবতা
নবম শ্রেণির বইয়ের নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) জারি হয়েছে গত ২৭ অক্টোবর, যার পর ২৮ দিন সময় পাওয়া যায় চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য। এভাবে হিসাব করলে ডিসেম্বরের আগে মুদ্রণ শুরু করা সম্ভব নয়, অথচ ছাপাতে সময় লাগবে প্রায় ৭০ দিন। এরপর বাঁধাই, প্যাকেজিং এবং সারা দেশে পাঠানোর কাজ মিলিয়ে ফেব্রুয়ারি পার হয়ে যাবে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের নোয়া জারি হয়েছে আরও পরে—গত বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ সেই বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে মার্চের আগেই অসম্ভব।
এনসিটিবির অভ্যন্তরীণ অরাজকতা ও রাজনৈতিক প্রভাব
এনসিটিবির ভেতরের বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বকে অনেকেই এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা করছেন। ছাত্রদল সম্প্রতি এক বিবৃতিতে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) ড. রিয়াদ চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রবিউল কবীর চৌধুরীর অপসারণ দাবি করেছে, অভিযোগ তুলে যে তারা দুর্নীতিপরায়ণ সিন্ডিকেটকে রক্ষা করছেন।
প্রাথমিকের ৩০ শতাংশ বই নিম্নমানের কাগজে
এবার প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের প্রায় ৩০ শতাংশই নিম্নমানের কাগজে ছাপানো হয়েছে, যা সরকারি নিয়ম ও মানদণ্ডের স্পষ্ট লঙ্ঘন। বইয়ের মান যাচাইয়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা ছাপাখানা মালিকদের কাছ থেকে ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে নিম্নমানের কাগজকে ভালো মানের সার্টিফিকেট দিয়েছে।
একাধিক প্রেস মালিক অভিযোগ করেছেন, তারা বাধ্য হয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে টাকা দিয়েছেন, না দিলে কাগজের অনুমোদন আটকে দেওয়া হতো। তবে ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন-এর মালিক মো. মনির এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “কাগজের মানে কোনো আপস করা হয়নি; বরং কিছু মালিক আমাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছেন, যা আমি প্রত্যাখ্যান করেছি।”
বইহীন শিক্ষার্থীর প্রজন্মের আশঙ্কা
এখন প্রশ্ন উঠছে—যখন বই ছাপা, বাঁধাই ও সরবরাহের এত বড় প্রক্রিয়া সামনে, তখন মাত্র দেড় মাসে কীভাবে ৩০ কোটিরও বেশি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব? শিক্ষাবিদরা আশঙ্কা করছেন, ২০২৬ সালের শুরুতে অন্তত এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী বইহীন অবস্থায় ক্লাস শুরু করতে বাধ্য হবে, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ও মানহ্রাসের সৃষ্টি করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার ফল। সময়মতো বই ছাপা ও সরবরাহে গাফিলতি অব্যাহত থাকলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও নৈতিকতার ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।










