বিশ্বের বৃহত্তম কৃত্রিম দ্বীপে বিমানবন্দর নির্মাণ করছে চীন
- Update Time : ০৩:০২:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৩১ Time View

চীন আবারও বিশ্বকে চমকে দিতে চলেছে তার প্রকৌশল দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে। দেশটি নির্মাণ করছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম দ্বীপভিত্তিক বিমানবন্দর— দালিয়ান জিনঝৌ বে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। উত্তর-পূর্ব চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের উপকূলীয় শহর দালিয়ানের কাছে ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মানবসৃষ্ট দ্বীপের ওপর এই মহাপ্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। আকার ও অবকাঠামোর দিক থেকে এটি হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও জাপানের বিখ্যাত কানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—উভয়কেই ছাড়িয়ে যাবে বলে জানা গেছে।
নতুন এই বিমানবন্দরটির নির্মাণ শুরু হয়েছে চীনের সামুদ্রিক প্রকৌশলের এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে। বিশাল জলভাগ ভরাট করে তৈরি করা হচ্ছে এই দ্বীপ, যা সমুদ্রের ঢেউ ও ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ্য করার মতোভাবে নকশা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নির্মিত হলে শুধু বিমান চলাচল নয়, বরং সমুদ্রভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও চীন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
বিমানবন্দরে থাকবে চারটি দীর্ঘ রানওয়ে এবং ৯ লাখ বর্গমিটারের অত্যাধুনিক যাত্রী টার্মিনাল। প্রাথমিকভাবে এটি বছরে ৪ কোটি ৩০ লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে, যা পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ৮ কোটি যাত্রী ও ১০ লাখ টন কার্গো সামলানোর সক্ষমতায় উন্নীত করা হবে। এ ছাড়া এখানে থাকবে বৃহৎ কার্গো টার্মিনাল, রক্ষণাবেক্ষণ হ্যাঙ্গার, হাই-স্পিড রেল সংযোগ এবং সমুদ্রপথে যাতায়াতের সুবিধা। বিমানবন্দরটি বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান— এয়ারবাস A380 এবং বোয়িং 777X পরিচালনার উপযোগী করেই নির্মিত হচ্ছে।
প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরোপুরি চালু হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দালিয়ান জিনঝৌ বে বিমানবন্দর শুধুমাত্র চীনের বিমান পরিবহন খাতে এক নতুন অধ্যায় নয়, বরং এটি হবে উত্তর-পূর্ব এশিয়ার একটি কৌশলগত কেন্দ্র, যা চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক সংযোগকে আরও শক্তিশালী করবে।
চীনের বাণিজ্যিক ও পর্যটন খাতের জন্য এটি এক গেমচেঞ্জার হতে যাচ্ছে। বিমানবন্দরটি চালু হলে দালিয়ান শহরটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ব্যবসা ও পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। পাশাপাশি এটি বেইজিং, সাংহাই ও গুয়াংজুর পর চীনের চতুর্থ বৃহৎ এভিয়েশন হাব হিসেবে আবির্ভূত হবে।
প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিমানবন্দর কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়—এটি চীনের প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক। সমুদ্রের বুকে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে সেখানে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর স্থাপন করা এক সময় কল্পনার বিষয় ছিল; কিন্তু চীন সেটিকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের নগরায়ণ ও বৈশ্বিক সংযোগের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, দালিয়ান জিনঝৌ বে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও পরিবহন মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নিকটবর্তী অবস্থান এটিকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীভবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে—যা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) লক্ষ্য পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন শুধু একটি বিমানবন্দর নয়, বরং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক পরিবহন অবকাঠামোর নতুন দিগন্ত নির্মাণ করছে—যেখানে প্রযুক্তি, কৌশল, পরিবেশ ও অর্থনীতি মিলিত হয়ে গড়ে তুলবে আগামী শতাব্দীর টেকসই উন্নয়নের মডেল।










