১৫ নভেম্বর থেকে নতুন পোশাকে পুলিশ
- Update Time : ০৭:৪৪:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৪৯ Time View

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী আসছে ১৫ নভেম্বর থেকে সম্পূর্ণ নতুন পোশাকে মাঠে নামছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত নীল রঙের পোশাকের পরিবর্তে এখন থেকে দেশের পুলিশ সদস্যরা পরবেন আয়রন বা লোহার রঙের ইউনিফর্ম। কনস্টেবল থেকে শুরু করে আইজিপি পর্যন্ত সব স্তরের কর্মকর্তারা একই রঙের পোশাক পরবেন। প্রথম ধাপে মহানগর পুলিশ, নৌপুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)—এই চারটি ইউনিটকে নতুন পোশাক সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিটি সদস্যকে দেওয়া হবে দুই সেট হাফ স্লিভ এবং এক সেট ফুল স্লিভ ইউনিফর্ম।
নতুন ইউনিফর্ম চালুর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী পুলিশ পোশাকের যুগের অবসান ঘটছে। তবে পুলিশের সেরিমনিয়াল পোশাক—যা জাতীয় দিবস বা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়—তা অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
সংস্কারের অংশ হিসেবে নতুন পোশাক
জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা ও পরবর্তী সময়ে বাহিনীর প্রতি জনআস্থার সংকটের প্রেক্ষাপটে এই পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৫ আগস্টের পর পুলিশের অনেক নিরপরাধ সদস্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এ অবস্থায় বাহিনীর মনোবল পুনর্গঠন, সংস্কার ও জনমুখী চেহারা ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে—যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই পোশাক পরিবর্তন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, “প্রথম ধাপে মহানগর, হাইওয়ে, নৌপুলিশ ও পিবিআই সদস্যদের নতুন ইউনিফর্ম দেওয়া হচ্ছে। পরে ধাপে ধাপে পুলিশের অন্যান্য ইউনিটেও এটি সরবরাহ করা হবে।” তিনি আরও জানান, র্যাবের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
র্যাব ও অন্যান্য বাহিনীর পোশাক পরিবর্তন
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেছেন, “যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ততদিন পর্যন্ত পুরোনো ডিজাইনের পোশাকই থাকবে।” সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, র্যাব, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর পোশাক পরিবর্তন একই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সচিবালয়ে ইতোমধ্যেই নতুন পোশাকের ট্রায়াল
প্রথমদিকে নতুন কাপড়ের রঙ নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠলেও শেষ পর্যন্ত পোশাক নির্ধারণ কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুলিশ ইউনিফর্ম পর্যালোচনা করে গাঢ় নীলের পরিবর্তে আয়রন রঙকে চূড়ান্ত করে। নতুন এই রঙে এখন আর মহানগর পুলিশের ইউনিফর্মে কোনো আলাদা পার্থক্য থাকবে না। তবে এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন) এবং এসপিবিএন (স্পেশাল সিকিউরিটি ব্যাটালিয়ন)—এই দুটি ইউনিটের পোশাকে আপাতত কোনো পরিবর্তন আসছে না।
লোগোতেও পরিবর্তন
পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের লোগোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বের প্রতীকে থাকা নৌকা সরিয়ে এর জায়গায় যুক্ত করা হয়েছে শাপলা ফুল, ধান ও গমের শীষ—যা বাংলাদেশের শান্তি, কৃষি এবং উৎপাদনশীলতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক নয়, বরং এটি মনোভাব ও নৈতিকতার সংস্কার প্রতিফলিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেছেন, “কেবল পোশাক পরিবর্তন করলেই হবে না, মানসিকভাবে পুলিশকে পরিবর্তিত হতে হবে। পুলিশের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, মানবিক আচরণে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।”
ডিএনসির সঙ্গে পোশাকের মিল নিয়ে আশঙ্কা
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের নতুন পোশাকের রঙ তাদের ইউনিফর্মের সঙ্গে অনেকটাই মিলে গেছে। ফলে ভবিষ্যতে যদি পুলিশ আপত্তি তোলে, তবে ডিএনসিকে চতুর্থবারের মতো পোশাক পরিবর্তন করতে হতে পারে।
ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, “এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে মন্ত্রণালয়ই বিষয়টি দেখবে। আমাদের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আলোচনার প্রয়োজন হয়নি।”
সমাপনী মন্তব্য
পোশাক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে পুলিশ বাহিনীতে এক ধরনের নতুন উদ্দীপনা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সরকারের আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনী আরও আধুনিক, সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব হয়ে উঠবে। বাহিনীর নতুন আয়রন রঙের পোশাক কেবল চেহারার পরিবর্তন নয়—এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের পুলিশ সংস্কারের এক প্রতীকী সূচনা।










