হুন্ডির দৌরাত্ম্য বাড়ছে, সতর্ক কেন্দ্রীয় ব্যাংক: নির্বাচনের আগে আর্থিক খাতে অস্থিরতার শঙ্কা
- Update Time : ০৭:৫৬:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৪০ Time View

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতা ও অর্থপাচারের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, নির্বাচনের সময় ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সুযোগে হুন্ডি ব্যবসা, জালনোটের প্রবাহ এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক মুদ্রা লেনদেন আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বর্তমানে বৈধ পথে রেমিটেন্স পাঠানো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ব্যাংকগুলোও এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, যাতে হুন্ডি চক্র পুনরায় সক্রিয় হতে না পারে।
রেমিটেন্সে ইতিবাচক প্রবণতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রেমিটেন্স এসেছে ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়ার ফলে একসময় হুন্ডি ব্যবসা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ডলারবাজারের কৃত্রিম সংকটও অনেকটা কমে যায়।
কিন্তু সম্প্রতি সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় আবারও হুন্ডির লেনদেন বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা বৈধ রেমিটেন্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হুন্ডি ও জালনোট রোধে যৌথ অভিযান
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বিএসএম, ডিএফআই, এনএসআই ও সিআইডিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা সংস্থার সঙ্গে যৌথ বৈঠক করেছে। সেখানে হুন্ডি ও জালনোট নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। নির্বাচন ঘিরে বাজারে জালনোট ছড়ানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, কারণ অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে—রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় জাল টাকা ছড়িয়ে অর্থনীতি ও জনগণের আস্থা নষ্টের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণ জনগণকে আহ্বান জানিয়েছে, ক্যাশলেস লেনদেনে অভ্যস্ত হতে এবং যতটা সম্ভব ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন করতে। এতে লেনদেন হবে নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং জালনোটের ঝুঁকিও কমবে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
অর্থনীতিবিদ ও ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, “নির্বাচনের সময় টাকার প্রচলন বেড়ে যায়। প্রার্থীরা প্রায়ই নগদ অর্থ ব্যবহার করে ভোটারদের কাছে পৌঁছান। ফলে বাজারে টাকার চাহিদা বাড়ে এবং এর সঙ্গে হুন্ডি
তিনি আরও বলেন, “শুভ লক্ষণ হলো ব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলারের দাম প্রায় সমান, যা প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করছে। এই ধারা ধরে রাখতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো দরকার এবং বড় অঙ্কের সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে করার ওপর জোর দিতে হবে।”
রেমিটেন্সে নতুন রেকর্ড
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জুলাইয়ে রেমিটেন্স এসেছে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৯ লাখ, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার এবং অক্টোবর মাসে তা বেড়ে আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
এর আগে মার্চ মাসে রেমিটেন্স প্রবাহ সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়, যা ছিল অর্থবছরের রেকর্ড। পুরো অর্থবছর শেষে প্রবাসী আয় দাঁড়ায় ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬.৮ শতাংশ বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “আমরা প্রবাসীদের সচেতন করতে কাজ করছি এবং ব্যাংকগুলোকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৈধ পথে রেমিটেন্সের ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকায় হুন্ডির ঝুঁকি সীমিত। তবে পুরোপুরি বন্ধ না হলেও, হুন্ডির প্রভাব অনেকটাই কমে এসেছে।”
তিনি জানান, জালনোট শনাক্ত ও প্রতিরোধে একটি সমন্বিত গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। সীমান্ত, বাণিজ্যকেন্দ্র এবং নগদ লেনদেনপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযান ও মনিটরিং চলছে। বড় নোটের মাধ্যমে জালনোট প্রবাহ রোধে সীমান্ত এলাকায় বিশেষ প্রচারাভিযানও শুরু হয়েছে।
স্বচ্ছ লেনদেনে জোর
বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নির্দেশনায় বলেছে, জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচায় অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে লেনদেন নথিভুক্ত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা না হয়।
অফিসিয়াল রেকর্ডে না থাকা হুন্ডি চ্যানেলের অর্থকে অবৈধ আয়ের উৎস হিসেবে গণ্য করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
aনির্বাচন ঘিরে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা একযোগে কাজ করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদরা একযোগে জনগণ ও প্রবাসীদের আহ্বান জানিয়েছেন—
“বড় অঙ্কের সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করুন;
এটি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, জাতীয় অর্থনীতিরও সুরক্ষা।”
Source: Daily Janakantha










