বৃটেনে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌন নিপীড়ন ভয়াবহ মাত্রায়
- Update Time : ১১:২৫:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৩১ Time View

বৃটেনে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌন নিপীড়ন ভয়াবহ মাত্রায়
গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—প্রায় অর্ধেক নারী শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির শিকার
বৃটেনের চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে— এমন ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (BMA) পরিচালিত এক নতুন গবেষণায়। সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন নারী মেডিকেল শিক্ষার্থীর ৪ জনই যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এই হার ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ, চিকিৎসা শিক্ষার মতো মর্যাদাপূর্ণ ও সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও যৌন সহিংসতা এখন এক গভীর সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ অনলাইন দৈনিক টেলিগ্রাফ, যেখানে বলা হয়েছে— চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ক্লিনিকাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে এখন একটি ‘লিঙ্গবৈষম্যমূলক ও অনিরাপদ সংস্কৃতি’ প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়েছে। বিএমএ সতর্ক করেছে, এই সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে এই শিক্ষার্থীরা যখন জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় (NHS) চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেবেন, তখনও যৌন সহিংসতার এই সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
যৌন সহিংসতার ভয়াবহ পরিসংখ্যান
প্রায় ১,০০০ মেডিকেল শিক্ষার্থীর ওপর করা এই জরিপে দেখা গেছে, যৌন সহিংসতার অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—
- ৮৫টি যৌন আক্রমণের ঘটনা,
- ৩৭টি ধর্ষণ বা জোরপূর্বক যৌন নির্যাতন,
- ৪৩টি ড্রিংক স্পাইকিং (মাদক মিশিয়ে পানীয় খাওয়ানো),
- এবং ২৪টি অনুসরণ বা স্টকিংয়ের অভিযোগ।
এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যায় নয়, বরং এক ভয়াবহ বাস্তবতাকে নির্দেশ করে— যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ আশ্রয় নয়, বরং হয়রানির ভীতিকর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনিক অবহেলা ও বিশ্বাসের ভাঙন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌন হয়রানির ঘটনায় শিক্ষার্থীদের আস্থা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। অভিযোগকারীদের ৭৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা তদন্তের ফলাফলে একেবারেই সন্তুষ্ট নন। ৬০ শতাংশ বিশ্বাস করেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যতের ঘটনাগুলিও সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো— ৬৭
এক নারী শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার’ কারণে এক যৌন শিকারী ছাত্রকে পুনরায় ক্লাসে ফিরিয়ে আনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বলেছিল, “পুলিশে যেও না, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, “এক সহপাঠী রাতে আমাকে অনুমতি ছাড়া অশালীনভাবে স্পর্শ করে। আমি এতটাই আতঙ্কিত ছিলাম যে কিছুই বলতে পারিনি, কেঁদে ফেলেছিলাম। পরে বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে জানায়, যদি আমি অপরাধীর নাম না বলি, তবে সেটি আমার পেশাদার আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
ফলে ওই শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে আবারও নিজের নিপীড়কের সঙ্গে ক্লাস করতে হয়েছে।
ক্লিনিকাল প্রশিক্ষণেও যৌন মন্তব্য
শুধু সহপাঠী নয়, ক্লিনিকাল প্রশিক্ষণ চলাকালেও অনেক নারী শিক্ষার্থী রোগীদের কাছ থেকে যৌন মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। একজন জানান, “একজন পুরুষ রোগী বলেছিল, ‘আমার কী সৌভাগ্য, তিনজন সুন্দরী মেয়ে হাঁটু গেড়ে আমার পাশে।’ আমরা সবাই খুব অস্বস্তিতে পড়েছিলাম, কিন্তু পাশে থাকা চিকিৎসক কিছুই বলেননি— শুধু বিব্রতভাবে হেসে ফেললেন।”
এই ধরনের ‘নীরব মেনে নেওয়া সংস্কৃতি’ শিক্ষার্থীদের মনে করে দেয়, প্রতিবাদ করলেই তা ‘অপেশাদার আচরণ’ হিসেবে দেখা হবে। এর ফলে বহু শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
লিঙ্গবৈষম্য ও পেশাগত বৈষম্যও ভয়াবহ
জরিপে অংশ নেওয়া ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, চিকিৎসা শিক্ষায় লিঙ্গবৈষম্য একটি বড় সমস্যা।
এক নারী শিক্ষার্থী লিখেছেন, “আমাকে সার্জারির বদলে জেনারেল প্র্যাকটিসে যেতে বলা হয়েছিল, কারণ এটি ‘মেয়েদের জন্য ভালো’। তারা নাকি ভবিষ্যতে সন্তান নিলে কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারবে।”
এই মন্তব্য শুধু পেশাগত বৈষম্যের নয়, বরং নারীদের সক্ষমতাকে হেয় করার দৃষ্টান্ত।
‘সারভাইভিং ইন স্ক্রাবস’: পরিবর্তনের আহ্বান
ড. বেকি কক্স, যিনি ‘সারভাইভিং ইন স্ক্রাবস’ নামে যৌন নিপীড়নবিরোধী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন, বলেছেন— “এই তথ্য ভয়াবহ। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌন সহিংসতা কতটা গভীরভাবে প্রোথিত, তা এখানেই স্পষ্ট। মেডিকেল স্কুল ও এনএইচএস উভয়ই শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।”
সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড. চেলসি জেউইট বলেন, “আমরা সব চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আহ্বান জানাই— অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য বিশেষ সহায়তা, অপরাধীদের জবাবদিহি ও সংস্কৃতি পরিবর্তনের মাধ্যমে যৌন সহিংসতা বন্ধ করতে হবে।”
বিএমএ’র কঠোর আহ্বান
বিএমএ’র প্রতিনিধি এরিন ম্যাকক্যাব বলেছেন, “এই ফলাফল অত্যন্ত বেদনাদায়ক, তবে দুঃখজনকভাবে আমাদের কারও জন্যই তা বিস্ময়ের নয়। আমরা কৃতজ্ঞ সেই সাহসী শিক্ষার্থীদের প্রতি, যারা নিজেদের গল্প তুলে ধরেছেন। তাদের সাহসই প্রকাশ করেছে এমন এক সংস্কৃতি, যার কোনো স্থান থাকা উচিত নয় বিশ্ববিদ্যালয়, এনএইচএস কিংবা সমাজের কোথাও।”
বিএমএ কর্তৃপক্ষ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—
- উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আইনি দায়িত্ব আরোপ করতে হবে,
- যৌন সহিংসতার একক ও কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে,
- এবং সব মেডিকেল স্কুলে সমন্বিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
গবেষণাটি দেখিয়েছে, বৃটেনের চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন নিপীড়ন ও লিঙ্গবৈষম্য এখন এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। শিক্ষার্থীরা যে পরিবেশে ভবিষ্যতের চিকিৎসক হিসেবে গড়ে উঠছেন, সেটি নিরাপত্তাহীনতা ও অবহেলার এক অন্ধকার সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন।
যদি দ্রুত নীতিগত পরিবর্তন, স্বচ্ছ তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করা হয়— তবে এই সংকট ভবিষ্যতের এনএইচএসেও শিকড় গেড়ে বসবে, এবং চিকিৎসা পেশার মানবিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে।










