পেঁয়াজ আমদানির সুপারিশ ট্যারিফ কমিশনের: বাজার স্থিতিশীলতায় ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান
- Update Time : ০৫:০৮:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
- / ২০৩ Time View

প্রতিবছরের মতো এবারও অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মৌসুমি এই সময়ে দেশে সরবরাহ কমে গেলে দাম বেড়ে যায়, আর এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত শুক্রবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য মারাত্মক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীল রাখতে দ্রুত পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। ট্যারিফ কমিশন মনে করছে, বাজারে কেজিপ্রতি দাম ১১০ টাকায় পৌঁছানো পরিস্থিতিতে এখনই আমদানি উন্মুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে সরবরাহ বাড়ে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে আসে।
চিঠি পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে
বিটিটিসি গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্যসচিব ও কৃষিসচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কারণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষকেরা পেঁয়াজের বাড়তি দামের সুবিধা পাচ্ছেন না—বরং মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারি ব্যবসায়ীরাই লাভবান হচ্ছেন।
বিটিটিসির বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, আমদানি অনুমোদন দিলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব হ্রাস পাবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে। এতে সাধারণ ভোক্তারা ন্যায্য মূল্যে পেঁয়াজ কিনতে পারবেন, পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির প্রবণতাও কমে আসবে।
আমদানির প্রধান উৎস ভারত, তবে বিকল্প দেশও আছে
ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পেঁয়াজ আমদানির প্রায় ৯৯ শতাংশই ভারত থেকে আসে। এর বাইরে অল্প পরিমাণে তুরস্ক, পাকিস্তান, মিয়ানমার, চীন ও মিসর থেকেও পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। গত অর্থবছরে দেশে মোট ৪ লাখ ৮৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে, যার ওপর বর্তমানে ১০ শতাংশ শুল্ককর প্রযোজ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত যদি রপ্তানি বন্ধ রাখে বা সীমিত করে, তখন বিকল্প উৎস দেশগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মিয়ানমার ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আনার ক্ষেত্রে দ্রুত প্রক্রিয়া শুরু করা গেলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি অনেকটাই পূরণ সম্ভব।
দেশীয় উৎপাদন যথেষ্ট নয়
গত অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার টন। কিন্তু সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে ও পরিবহনজনিত সমস্যায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়। ফলে বাজারে সরবরাহ এসেছে মাত্র ৩৩ লাখ টনের মতো, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উৎপাদন-সংরক্ষণ বৈষম্যই প্রতিবছর দাম বৃদ্ধির মূল কারণ। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণাগারের ঘাটতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কৃষকদের হাতে ন্যায্য দাম পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষণ: স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন
অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্যারিফ কমিশনের এই সুপারিশ একটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হলেও এটি কেবল অস্থায়ী সমাধান দিতে পারে। পেঁয়াজের দামের স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি—যেমন আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, এবং স্থানীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো।
পাশাপাশি ভারতনির্ভর আমদানি নীতির পরিবর্তে বহুমুখী উৎস নির্ভর কৌশল গড়ে তুলতে হবে। কারণ প্রতিবছর ভারতের রপ্তানি নীতি পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।
বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজারে মৌসুমি অস্থিরতা এখন প্রায় নিয়মিত। তাই ট্যারিফ কমিশনের আমদানির সুপারিশ সময়োপযোগী হলেও, সরকারকে এখনই স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই দিকেই চিন্তা করতে হবে। তা না হলে কয়েক মাস পর আবারও একই সমস্যায় পড়তে হবে কৃষক ও ভোক্তা—দু’পক্ষকেই।










