সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

থাইল্যান্ড সফরে চার দিনে ৪০ যৌনকর্মীর সঙ্গে বিলাসবহুল হোটেলে সময়

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৪:৫৮:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২০৭ Time View

ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাবেক সদস্য ও রাজপদচ্যুত প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু লাউনি সম্প্রতি এক বিস্ফোরক অভিযোগে জানিয়েছেন—২০০০ সালের শুরুর দিকে সরকারি দায়িত্বে বিদেশ সফরের আড়ালে প্রিন্স অ্যান্ড্রু একাধিক বিলাসবহুল ছুটি কাটাতেন এবং সেসব সফরে নারীসঙ্গ উপভোগ করতেন।

ডেইলি মেইলের অনুসন্ধানমূলক পডকাস্ট ‘ডিপ ডাইভ: দ্য ফল অব দ্য হাউস অব ইয়র্ক’-এ ইতিহাসবিদ লাউনি জানান, “২০০১ সালে অ্যান্ড্রুর বয়স ছিল ৪১ বছর। তিনি তখন এক ধরনের ‘মধ্যবয়সী সঙ্কট’-এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাজকীয় মর্যাদা ও সরকারি পদ ব্যবহার করে তিনি প্রায়ই বিদেশ সফরে যেতেন, তবে এসব সফরের অনেকটাই সরকারি নয়—ব্যক্তিগত আনন্দযাত্রা ছিল।”

লাউনি আরও বলেন, করদাতাদের অর্থে অর্থায়িত এসব সফরে অ্যান্ড্রু নিয়মিতভাবে নিজের জন্য অতিরিক্ত দুই সপ্তাহের “ব্যক্তিগত ছুটি” রাখতেন। অর্থাৎ সরকারি কাজের ফাঁকে তিনি বিলাসবহুল রিসোর্ট, নাইটক্লাব ও ব্যক্তিগত পার্টিতে সময় কাটাতেন—যার সব খরচ বহন করত যুক্তরাজ্যের জনগণের করের টাকা।

থাইল্যান্ড সফরের চাঞ্চল্যকর ঘটনা

ইতিহাসবিদের দাবি, ২০০১ সালে থাইল্যান্ডের রাজা’র জন্মদিন উপলক্ষে অ্যান্ড্রু যুক্তরাজ্যের সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংকক সফরে যান। কিন্তু প্রথানুযায়ী ব্রিটিশ দূতাবাসে না থেকে তিনি নিজের পছন্দমতো পাঁচ তারকা হোটেলে উঠেন। সেখানে মাত্র চার দিনের মধ্যে ৪০ জন যৌনকর্মীকে আনা হয়—যা স্থানীয় কূটনীতিক ও সহকারীদের সহায়তায় সংঘটিত হয় বলে অভিযোগ।

লাউনি জানান, “এই তথ্য শুধু অনুমান নয়—এটি একাধিক সূত্র থেকে যাচাই করা হয়েছে, এমনকি থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের এক সদস্যও ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।”

দূতাবাসের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া

থাইল্যান্ডে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক ইয়ান প্রাউড, যিনি সে সময় দূতাবাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ছিলেন, জানিয়েছেন, “অ্যান্ড্রুর নারীসঙ্গের ব্যাপারটি তখন দূতাবাসে সবারই জানা ছিল। এটি ছিল এক ধরনের ‘ওপেন সিক্রেট’। তিনি কখনও দূতাবাসে থাকতেন না, বরং নিজের পছন্দের বিলাসবহুল হোটেলে থাকতেন—যেখানে নিচতলায় তাঁর প্রিয় নাইটক্লাব ছিল।”

রাজকীয় মর্যাদা হারানোর পথে

এই কেলেঙ্কারির ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সকালে অ্যান্ড্রুর নাম যুক্তরাজ্যের ‘অফিশিয়াল রোল অব দ্য পিয়ারেজ’ তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় দেশটির সব ডিউক ও অভিজাতদের নাম সংরক্ষিত থাকে। ফলে এটি প্রিন্স অ্যান্ড্রুর রাজকীয় উপাধি ও মর্যাদা প্রত্যাহারের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে তিনি এখনও “ডিউক অব ইয়র্ক” উপাধিধারী এবং সিংহাসনের উত্তরাধিকার ক্রমে অষ্টম স্থানে রয়েছেন। তাঁকে সম্পূর্ণভাবে তালিকা থেকে সরাতে হলে যুক্তরাজ্যের সংসদে আইন পাসের পাশাপাশি কমনওয়েলথভুক্ত সব দেশের সম্মতিও লাগবে।

এপস্টিন কেলেঙ্কারির ছায়া

এর আগে মার্কিন ব্যবসায়ী জেফ্রি এপস্টিনের যৌন পাচার কেলেঙ্কারিতেও অ্যান্ড্রুর নাম জড়ায়। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে বাকিংহাম প্যালেস এ বিষয়ে স্পষ্ট জানায়—অ্যান্ড্রু “গুরুতর বিচারগত ভুল” করেছেন। এর পর থেকেই রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি প্যালেস থেকে জানানো হয়েছে, অ্যান্ড্রু এখন উইনডসর আবাস ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছেন। রাজপ্রাসাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “রাজা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর উপাধি, মর্যাদা ও সকল রাজকীয় সম্মান প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এখন থেকে তিনি ‘অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইনডসর’ নামে পরিচিত হবেন।”

বিশ্লেষণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি নয়; এটি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ভাবমূর্তির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। রাজপরিবারের প্রতি জনগণের আস্থা ও শ্রদ্ধা যে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে, প্রিন্স অ্যান্ড্রুর এই বিতর্কিত আচরণ তা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একসময় রাজকীয় কূটনীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও, এখন অ্যান্ড্রু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক লজ্জাজনক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন—যিনি রাজকীয় বিশেষাধিকারের অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে নিমজ্জিত ছিলেন।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

থাইল্যান্ড সফরে চার দিনে ৪০ যৌনকর্মীর সঙ্গে বিলাসবহুল হোটেলে সময়

Update Time : ০৪:৫৮:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫

ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাবেক সদস্য ও রাজপদচ্যুত প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু লাউনি সম্প্রতি এক বিস্ফোরক অভিযোগে জানিয়েছেন—২০০০ সালের শুরুর দিকে সরকারি দায়িত্বে বিদেশ সফরের আড়ালে প্রিন্স অ্যান্ড্রু একাধিক বিলাসবহুল ছুটি কাটাতেন এবং সেসব সফরে নারীসঙ্গ উপভোগ করতেন।

ডেইলি মেইলের অনুসন্ধানমূলক পডকাস্ট ‘ডিপ ডাইভ: দ্য ফল অব দ্য হাউস অব ইয়র্ক’-এ ইতিহাসবিদ লাউনি জানান, “২০০১ সালে অ্যান্ড্রুর বয়স ছিল ৪১ বছর। তিনি তখন এক ধরনের ‘মধ্যবয়সী সঙ্কট’-এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাজকীয় মর্যাদা ও সরকারি পদ ব্যবহার করে তিনি প্রায়ই বিদেশ সফরে যেতেন, তবে এসব সফরের অনেকটাই সরকারি নয়—ব্যক্তিগত আনন্দযাত্রা ছিল।”

লাউনি আরও বলেন, করদাতাদের অর্থে অর্থায়িত এসব সফরে অ্যান্ড্রু নিয়মিতভাবে নিজের জন্য অতিরিক্ত দুই সপ্তাহের “ব্যক্তিগত ছুটি” রাখতেন। অর্থাৎ সরকারি কাজের ফাঁকে তিনি বিলাসবহুল রিসোর্ট, নাইটক্লাব ও ব্যক্তিগত পার্টিতে সময় কাটাতেন—যার সব খরচ বহন করত যুক্তরাজ্যের জনগণের করের টাকা।

থাইল্যান্ড সফরের চাঞ্চল্যকর ঘটনা

ইতিহাসবিদের দাবি, ২০০১ সালে থাইল্যান্ডের রাজা’র জন্মদিন উপলক্ষে অ্যান্ড্রু যুক্তরাজ্যের সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংকক সফরে যান। কিন্তু প্রথানুযায়ী ব্রিটিশ দূতাবাসে না থেকে তিনি নিজের পছন্দমতো পাঁচ তারকা হোটেলে উঠেন। সেখানে মাত্র চার দিনের মধ্যে ৪০ জন যৌনকর্মীকে আনা হয়—যা স্থানীয় কূটনীতিক ও সহকারীদের সহায়তায় সংঘটিত হয় বলে অভিযোগ।

লাউনি জানান, “এই তথ্য শুধু অনুমান নয়—এটি একাধিক সূত্র থেকে যাচাই করা হয়েছে, এমনকি থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের এক সদস্যও ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।”

দূতাবাসের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া

থাইল্যান্ডে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক ইয়ান প্রাউড, যিনি সে সময় দূতাবাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ছিলেন, জানিয়েছেন, “অ্যান্ড্রুর নারীসঙ্গের ব্যাপারটি তখন দূতাবাসে সবারই জানা ছিল। এটি ছিল এক ধরনের ‘ওপেন সিক্রেট’। তিনি কখনও দূতাবাসে থাকতেন না, বরং নিজের পছন্দের বিলাসবহুল হোটেলে থাকতেন—যেখানে নিচতলায় তাঁর প্রিয় নাইটক্লাব ছিল।”

রাজকীয় মর্যাদা হারানোর পথে

এই কেলেঙ্কারির ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সকালে অ্যান্ড্রুর নাম যুক্তরাজ্যের ‘অফিশিয়াল রোল অব দ্য পিয়ারেজ’ তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় দেশটির সব ডিউক ও অভিজাতদের নাম সংরক্ষিত থাকে। ফলে এটি প্রিন্স অ্যান্ড্রুর রাজকীয় উপাধি ও মর্যাদা প্রত্যাহারের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে তিনি এখনও “ডিউক অব ইয়র্ক” উপাধিধারী এবং সিংহাসনের উত্তরাধিকার ক্রমে অষ্টম স্থানে রয়েছেন। তাঁকে সম্পূর্ণভাবে তালিকা থেকে সরাতে হলে যুক্তরাজ্যের সংসদে আইন পাসের পাশাপাশি কমনওয়েলথভুক্ত সব দেশের সম্মতিও লাগবে।

এপস্টিন কেলেঙ্কারির ছায়া

এর আগে মার্কিন ব্যবসায়ী জেফ্রি এপস্টিনের যৌন পাচার কেলেঙ্কারিতেও অ্যান্ড্রুর নাম জড়ায়। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে বাকিংহাম প্যালেস এ বিষয়ে স্পষ্ট জানায়—অ্যান্ড্রু “গুরুতর বিচারগত ভুল” করেছেন। এর পর থেকেই রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি প্যালেস থেকে জানানো হয়েছে, অ্যান্ড্রু এখন উইনডসর আবাস ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছেন। রাজপ্রাসাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “রাজা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর উপাধি, মর্যাদা ও সকল রাজকীয় সম্মান প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এখন থেকে তিনি ‘অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইনডসর’ নামে পরিচিত হবেন।”

বিশ্লেষণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি নয়; এটি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ভাবমূর্তির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। রাজপরিবারের প্রতি জনগণের আস্থা ও শ্রদ্ধা যে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে, প্রিন্স অ্যান্ড্রুর এই বিতর্কিত আচরণ তা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একসময় রাজকীয় কূটনীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও, এখন অ্যান্ড্রু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক লজ্জাজনক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন—যিনি রাজকীয় বিশেষাধিকারের অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে নিমজ্জিত ছিলেন।