জাহানারার যৌন নিপীড়ন অভিযোগে টালমাটাল নারী ক্রিকেটপাড়া
- Update Time : ০৩:০১:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৭২ Time View

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে অভূতপূর্ব এক ঝড় বইছে। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও অভিজ্ঞ পেসার জাহানারা আলমের সাম্প্রতিক দুটি সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা—নারী ক্রিকেটে যৌন নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এতদিন যেসব অভিযোগ ফিসফিস করে ঘুরে বেড়াত, তা এবার প্রকাশ্যে আসায় পুরো ক্রিকেটপাড়া টালমাটাল।
জাহানারার প্রকাশিত বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য, যা শুধু বিসিবিকেই নয়, পুরো ক্রীড়াঙ্গনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। নারী ক্রিকেটে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা, কোচ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন—কারণ, অভিযোগের তীর যেকোনো সময় তাঁদের দিকেও যেতে পারে।
প্রথমে বিসিবি (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুললে, অবশেষে জরুরি ভিত্তিতে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে এখনো প্রশ্ন থেকেই গেছে—এই তদন্ত কতটা স্বচ্ছ হবে, এবং অভিযুক্ত মঞ্জুরুল ইসলামসহ যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে বাস্তব সত্য কি প্রকাশ করবে বিসিবি?
সরকারের নজরদারি ও কঠোর নির্দেশ
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ইতোমধ্যেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হতে পারে। তাঁর ভাষায়,
“এটি একটি গুরুতর অপরাধ। যদি ভুক্তভোগী আইনি পদক্ষেপ নিতে চান, সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে।”
অভিযুক্তের অস্বীকার
অন্যদিকে, অভিযুক্ত মঞ্জুরুল ইসলাম—যিনি একসময় নারী ক্রিকেট দলের নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন—চীনে অবস্থান থেকে এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি,
“সব অভিযোগই মিথ্যা। দলের অন্য মেয়েদের জিজ্ঞেস করলে বুঝতে পারবেন।”
তবে ক্রিকেট মহলে গুঞ্জন থামছে না। অনেকেই বলছেন, জাহানারার মতো সিনিয়র ক্রিকেটার এমন গুরুতর অভিযোগ যদি প্রকাশ্যে আনেন, তাহলে নিশ্চয়ই এর পেছনে বাস্তব কোনো অভিজ্ঞতা রয়েছে।
অভিযোগের ভয়াবহ বিবরণ
জাহানারা আলমের অভিযোগের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি হলো তাঁর বিরুদ্ধে মঞ্জুরুল ইসলামের অনৈতিক আচরণের বর্ণনা। তিনি জানান,
“উনি (মঞ্জুরুল) একদিন আমার কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলেন—‘তোর পিরিয়ডের কতদিন চলছে? শেষ হলে বলিস, আমার দিকটাও তো দেখতে হবে।’ এরপর বলেন, ‘পিরিয়ড শেষ হলে, যখন ডাকব চলে আসিস।’”
এমন অশালীন আচরণ শুধু নারী ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং খেলাধুলায় নারীর নিরাপত্তা ও সম্মানের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ব্যাপক প্রভাব ও নারী খেলোয়াড়দের শঙ্কা
এই অভিযোগের পর নারী ক্রিকেটারদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এমন ঘটনায় ভবিষ্যতে পরিবারগুলো মেয়েদের খেলাধুলায় পাঠাতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। এক অভিভাবক বলেন, “আমরা ভাবছি, যদি জাতীয় দলে এমন পরিস্থিতি হয়, তাহলে মেয়েরা কীভাবে নিরাপদ থাকবে?”
অতীতের আড়ালে থাকা গল্প
জাহানারার অভিযোগ একা নয়—বিভিন্ন সময়ে ক্লাব ক্রিকেটে কোচ বা কর্মকর্তাদের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন আরও অনেক নারী ক্রিকেটার। তাঁদের অনেকে ভয়ে বা ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় চুপ থেকেছেন। ক্রিকেট মহলে এমনও গুঞ্জন রয়েছে যে, একাধিক ক্লাব কোচের বিরুদ্ধেও নারী খেলোয়াড়দের শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ আছে।
প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ দিক
জাহানারা আলম বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি শুধু প্রথম তারকা নারী ক্রিকেটার নন, ছিলেন জাতীয় দলের সফল অধিনায়কও। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস করছেন এবং ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি কোচিং কোর্সে অংশ নিচ্ছেন। তাঁর সাম্প্রতিক দুটি সাক্ষাৎকার—একটি পত্রিকায় ও একটি ইউটিউব চ্যানেলে—নারী ক্রিকেটের অন্ধকার দিক উন্মোচন করে দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন—বিসিবি কি সত্যিই নিরপেক্ষ তদন্ত করবে? অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনবে? নাকি আগের মতো বিষয়টি সময়ের সঙ্গে ধামাচাপা পড়ে যাবে?
যা-ই ঘটুক না কেন, জাহানারার এই সাহসী পদক্ষেপ বাংলাদেশের নারী ক্রীড়া ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। কারণ তিনি এমন এক সত্যকে প্রকাশ করেছেন, যা বহু বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল ভয়ের, ক্ষমতার এবং নীরবতার আড়ালে।
এখন সময় এসেছে, নারী ক্রীড়াবিদদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং শূন্য-সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করার। অন্যথায়, এই কেলেঙ্কারি শুধু ক্রিকেট নয়, পুরো দেশের নারী খেলাধুলার ভবিষ্যতকে গভীর সংকটে ফেলবে।










