চাকসুর নামে নেই ব্যাংক হিসাব, উধাও কোটি টাকার ফি—প্রশ্নবিদ্ধ চবি প্রশাসন
- Update Time : ০৯:২৮:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
- / ২০২ Time View

৩৫ বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফিরে এলেও শুরুতেই সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—চাকসুর নামে কোনো ব্যাংক হিসাব বা নির্দিষ্ট তহবিলই নেই! অথচ বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চাকসু ফি হিসেবে কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়েছে। এই বিপুল অর্থ কোথায় গেল, তা নিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চলছে তীব্র বিতর্ক।
চবি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রতিবছর ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চাকসু ফি হিসেবে আদায় করা হয় গড়ে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। এই হিসেবে গত ৩৫ বছরে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় চার কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু সেই অর্থ কোথায় সংরক্ষিত ছিল বা কীভাবে খরচ হয়েছে—তার কোনো নির্ভরযোগ্য রেকর্ড নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিয়ামক মো. আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, “চাকসুর কোনো আলাদা ব্যাংক হিসাব নেই। শিক্ষার্থীদের চাকসু ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল অ্যাকাউন্টেই জমা হয়। চাকসু নির্বাচন না থাকলেও তার আওতাধীন কার্যক্রম চলত, সেখানে স্টাফদের বেতন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের খরচ হতো। চাকসুর বার্ষিক আয় যেখানে প্রায় ১২ লাখ টাকা, সেখানে বার্ষিক ক্রীড়া আয়োজনে ব্যয় হয় ৬০ লাখের বেশি, যা বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই বহন করে।” তিনি বলেন, “নতুন করে যেহেতু নির্বাচন হয়েছে, ভবিষ্যতে চাকসুর জন্য আলাদা তহবিল গঠনের পরিকল্পনা আছে।”
তবে নবনির্বাচিত চাকসু নেতৃত্ব এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, “আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর জানতে পারি, চাকসুর কোনো ফান্ডই নেই। ৩৫ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হয়েছে, তার হিসাব আমরা প্রশাসনের কাছে চেয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট জবাব পাইনি।” তিনি আরও বলেন, “ভিসি স্যার অর্থ নিয়ামক দপ্তরকে হিসাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আমরা নির্দিষ্ট সময়সীমা জানতে চাইলে তা দেওয়া হয়নি। আমরা কয়েক দিনের মধ্যে আবার প্রশাসনকে নোটিশ দেব।”
সহ–সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, “প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা ফি আদায় হয়েছে, অথচ এখন চাকসুর হাতে এক টাকাও নেই—এটা অগ্রহণযোগ্য। আমরা শিগগিরই বাজেট প্রস্তাব তৈরি করে প্রশাসনের কাছে স্বচ্ছতার দাবি জানাব। শিক্ষার্থীদের টাকা শিক্ষার্থীদের জানার অধিকার।”
শিক্ষার্থীদের মাঝেও এ নিয়ে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মেহজাবিন আক্তার বলেন, “আমরা ভর্তি সময় চাকসু ফি দিয়েছি। এখন যদি চাকসুর নামে কোনো হিসাবই না থাকে, তাহলে এত বছরের টাকা গেল কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকেই দিতে হবে।” বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী মাহিমুল হক বলেন, “৩৫ বছর পর চাকসু ফিরে এসেছে, অথচ শুরুতেই অর্থের অস্বচ্ছতা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। টাকাগুলোর সঠিক ব্যবহার জানতে স্বাধীন অডিট কমিটি গঠন করা জরুরি।”
এই অডিটের দাবি সমর্থন করছেন অনেক শিক্ষকও। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের এই আর্থিক অস্বচ্ছতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে। প্রশাসনের উচিত হবে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং প্রতি বছরের চাকসু ফি আদায় ও ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ফাইন্যান্স কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার অবশ্য বিষয়টি কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “চাকসু না থাকলেও চাকসুর কার্যক্রম বন্ধ ছিল না। প্রতি বছর চাকসু খাত থেকে বিভিন্ন দিবস, খেলাধুলা, অনুষ্ঠান, স্টাফদের খরচসহ নানা কাজে ব্যয় হতো। তবে এই ব্যয় কোন খাত থেকে হয়েছে এবং কত টাকা খরচ হয়েছে, তা হিসাব অফিসই বলতে পারবে।” তিনি স্বীকার করেন, “চাকসুর কোনো ফান্ড নেই—এটা সত্য। তবে নতুন কমিটি নির্বাচিত হয়েছে, আমরা তাদের সুবিধা নিশ্চিত করব। প্রয়োজনে ইউজিসির (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) কাছে তহবিল চাওয়া হবে।”
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মনে করছে, প্রশাসনের এমন ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদের মতে, “যদি প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা আদায় হয়, তাহলে তার ব্যয়ের রেকর্ড না থাকা মানে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম।”
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—চাকসুর নামে আদায় করা কোটি টাকার ফি আসলে গেল কোথায়? নতুন নেতৃত্ব যেখানে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে চায়, সেখানে এই আর্থিক অস্বচ্ছতা শুরুতেই চাকসুর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক শৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীদের আস্থার স্বার্থে দ্রুত একটি স্বাধীন অডিট কমিটি গঠন, সব বছরের হিসাব প্রকাশ এবং ভবিষ্যতের জন্য চাকসুর আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় এই বিতর্ক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।
সুত্রঃ দৈনিক আজাদী











