রেকর্ড দীর্ঘ শাটডাউনে যুক্তরাষ্ট্রে অচল প্রশাসন, স্থবির আকাশপথে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি
- Update Time : ০৪:৫৯:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৪৭ Time View

যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ শাটডাউন এখন অর্থনীতি, পরিবহন ব্যবস্থা ও জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। টানা ৩৭ দিন ধরে চলমান এই শাটডাউনে দেশটির অর্থনীতি প্রতি সপ্তাহে ১০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
সরকারি তহবিল অনুমোদনে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার ফলে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত দীর্ঘ বৈঠকেও দুই দল কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। রিপাবলিকানদের প্রস্তাবে সরকারি সংস্থাগুলো পুনরায় চালু করা ও ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের পুনর্বহালের আহ্বান জানানো হলেও, ডেমোক্র্যাটরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলস্বরূপ, প্রশাসনিক অচলাবস্থা আরও গভীর হয় এবং দেশের প্রধান খাতগুলোতে বিপর্যয় নেমে আসে।
বিমান চলাচলে বিপর্যয়
শাটডাউনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি প্রধান বিমানবন্দরে বিমান চলাচল সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিমান চলাচল ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হবে, যার ফলে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হবে। প্রতিদিন প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ ফ্লাইট বাতিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডাফি আরও বলেন, “আমাদের প্রধান দায়িত্ব যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি রাজনীতির বিষয় নয়, বরং বাস্তব ঝুঁকি মূল্যায়নের ফলাফল। বিমান নিয়ন্ত্রণকারীরা বর্তমানে অতিরিক্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত, অথচ তারা এখনো বেতন ছাড়াই কাজ করছেন।”
এফএএ (Federal Aviation Administration)-এর প্রধান জানান, বিমান নিয়ন্ত্রণকারীদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বেড়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ ফেডারেল কর্মচারী বেতন ছাড়াই কাজ করছেন অথবা বাধ্যতামূলক ছুটিতে রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন বিমান নিয়ন্ত্রক, নিরাপত্তা কর্মী, পার্ক রেঞ্জার এবং বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা।
প্রভাবিত বিমানবন্দর ও যাত্রী ভোগান্তি
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আটলান্টা, নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, শিকাগো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর হার্টসফিল্ড-জ্যাকসন
যাত্রী ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে, কারণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বিভাগে কর্মীসংকট দেখা দিয়েছে। ফ্রন্টিয়ার এয়ারলাইন্স যাত্রীদের সতর্ক করে জানিয়েছে, বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে অন্য এয়ারলাইন্স থেকে টিকিট কিনে রাখতে। যদিও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো আপাতত এই সিদ্ধান্তের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
মানসিক চাপে ফেডারেল কর্মচারীরা
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারী ইউনিয়নগুলো বলছে, দীর্ঘ সময় বেতন না পাওয়ায় অনেক কর্মী মানসিক চাপ ও উদ্বেগে ভুগছেন। কেউ কেউ পারিবারিক ব্যয় মেটাতে দ্বিতীয় চাকরি নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারের অচলাবস্থার কারণে বহু সরকারি সেবা যেমন সামাজিক নিরাপত্তা, ট্যাক্স রিফান্ড, স্বাস্থ্যখাত ও জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থাপনা কার্যত স্থবির হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণ
প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সংস্থাগুলো কংগ্রেসের অনুমোদিত তহবিলের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। নতুন অর্থবছর শুরু হয় ১ অক্টোবর, এর আগে কংগ্রেসে বাজেট পাস ও প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। কিন্তু এবার রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধের কারণে বাজেট চুক্তি সম্পন্ন হয়নি, যার ফলে সরকার আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিফলন, যা মার্কিন প্রশাসনের কার্যকারিতা ও জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
অর্থনীতিতে ধাক্কা
শাটডাউনের কারণে অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সরকারি ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ থাকায় বাজারে চাহিদা কমেছে, ব্যবসায়িক আস্থা নেমে গেছে, এবং ভোক্তা ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতে ০.৩ থেকে ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, “যদি অবস্থা দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে এই শাটডাউন কেবল প্রশাসনিক নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ওপরও প্রশ্ন তুলবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের এই শাটডাউন এখন কেবল রাজনৈতিক মতবিরোধের প্রতীক নয়; এটি নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলছে—পরিবহন, নিরাপত্তা, গবেষণা, শিক্ষা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘ অচলাবস্থা যতদিন চলবে, ততদিন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশটি তার নিজস্ব প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কাছে বন্দি হয়ে থাকবে।
সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএন










