সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাত্র ১০ দিনেই দ্বিগুণ দাম পেঁয়াজের: কেন এমন লাগামছাড়া বাজার?

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৩:১২:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২৮৬ Time View

দেশের বাজারে আবারও পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়ে উঠেছে অস্বাভাবিকভাবে। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে এই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত সবাই পড়েছেন বিপাকে। বাজারজুড়ে চলছে উদ্বেগ আর অসন্তোষের ঢেউ।

রাজধানী ঢাকার কাওরানবাজার, মিরপুর, শ্যামবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে—বুধবার (৬ নভেম্বর) প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে। পাইকারি পর্যায়েও প্রতি কেজির দাম ৯৫ থেকে ১০৫ টাকায় পৌঁছেছে।

সরবরাহ সংকট ভারতীয় আমদানি বন্ধ

ব্যবসায়ীদের মতে, পেঁয়াজের মৌসুম শেষ হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনের সরবরাহ কমে গেছে। এর ওপর ভারত থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় বাজারে তীব্র যোগান সংকট তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর গুদারাঘাট বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী রিপন মিয়া বলেন, “গতকালই বিক্রি করেছি ১০০ টাকায়, আজ ১২০ টাকার নিচে বিক্রি করা যাচ্ছে না। পাইকারিতে দাম প্রতিদিনই বাড়ছে, আমরা তো বাধ্য।”

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও রাজশাহীর পাইকারি ব্যবসায়ীরাও একই কথা বলছেন। তাঁদের মতে, ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির আইপি (Import Permit) দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বাজারে দেশি পেঁয়াজের ওপর চাপ বেড়েছে। দ্রুত আমদানির অনুমতি না দিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

বার্ষিক চাহিদা উৎপাদনের ঘাটতি

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৫ থেকে ২৭ লাখ টন। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন হয় মাত্র ২১ লাখ টন, ফলে ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর অন্তত ৬ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। এই আমদানির বেশিরভাগই আসে ভারত থেকে।
ভারতের বাজারে নিজস্ব সংকট ও রপ্তানি সীমিতকরণের কারণে এবার বাংলাদেশে রপ্তানি স্থগিত থাকায় অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ পড়েছে বহুগুণে।

কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ

ভোক্তা অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব) এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বাজার কারসাজির অভিযোগ তুলেছে। ক্যাবের সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, “দেশে পর্যাপ্ত স্টক থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। বাজার তদারকি দুর্বল থাকায় তারা সুযোগ নিচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার যদি এখনই বাজার মনিটরিং জোরদার করে এবং মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে নতুন ফসল বাজারে আসার আগেই দামের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।”

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে এখনও অন্তত তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। তার আগে যদি আমদানি অনুমতি না দেওয়া হয় বা পর্যাপ্ত নজরদারি না বাড়ানো হয়, তাহলে দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে বাজার আবারও স্থিতিশীল হতে পারে বলে তাদের মত।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

এদিকে সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, একের পর এক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজধানীর মালিবাগের এক গৃহিণী বলেন, “পেঁয়াজ ছাড়া রান্না কল্পনাই করা যায় না। এখন এক কেজি কিনতে ১২০ টাকা দিতে হচ্ছে—এটা একেবারেই অযৌক্তিক।”

মৌসুমি সংকট, আমদানি স্থগিত এবং বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট—এই তিন কারণ মিলেই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। সরকার এখন যদি দ্রুত আমদানির অনুমতি দেয়, বাজার তদারকি জোরদার করে এবং মজুদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। অন্যথায়, পেঁয়াজের এই অগ্নিমূল্য আরও কিছুদিন জ্বালিয়ে যেতে পারে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরকে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মাত্র ১০ দিনেই দ্বিগুণ দাম পেঁয়াজের: কেন এমন লাগামছাড়া বাজার?

Update Time : ০৩:১২:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫

দেশের বাজারে আবারও পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়ে উঠেছে অস্বাভাবিকভাবে। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে এই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত সবাই পড়েছেন বিপাকে। বাজারজুড়ে চলছে উদ্বেগ আর অসন্তোষের ঢেউ।

রাজধানী ঢাকার কাওরানবাজার, মিরপুর, শ্যামবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে—বুধবার (৬ নভেম্বর) প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে। পাইকারি পর্যায়েও প্রতি কেজির দাম ৯৫ থেকে ১০৫ টাকায় পৌঁছেছে।

সরবরাহ সংকট ভারতীয় আমদানি বন্ধ

ব্যবসায়ীদের মতে, পেঁয়াজের মৌসুম শেষ হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনের সরবরাহ কমে গেছে। এর ওপর ভারত থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় বাজারে তীব্র যোগান সংকট তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর গুদারাঘাট বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী রিপন মিয়া বলেন, “গতকালই বিক্রি করেছি ১০০ টাকায়, আজ ১২০ টাকার নিচে বিক্রি করা যাচ্ছে না। পাইকারিতে দাম প্রতিদিনই বাড়ছে, আমরা তো বাধ্য।”

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও রাজশাহীর পাইকারি ব্যবসায়ীরাও একই কথা বলছেন। তাঁদের মতে, ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির আইপি (Import Permit) দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বাজারে দেশি পেঁয়াজের ওপর চাপ বেড়েছে। দ্রুত আমদানির অনুমতি না দিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

বার্ষিক চাহিদা উৎপাদনের ঘাটতি

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৫ থেকে ২৭ লাখ টন। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন হয় মাত্র ২১ লাখ টন, ফলে ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর অন্তত ৬ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। এই আমদানির বেশিরভাগই আসে ভারত থেকে।
ভারতের বাজারে নিজস্ব সংকট ও রপ্তানি সীমিতকরণের কারণে এবার বাংলাদেশে রপ্তানি স্থগিত থাকায় অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ পড়েছে বহুগুণে।

কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ

ভোক্তা অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব) এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বাজার কারসাজির অভিযোগ তুলেছে। ক্যাবের সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, “দেশে পর্যাপ্ত স্টক থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। বাজার তদারকি দুর্বল থাকায় তারা সুযোগ নিচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার যদি এখনই বাজার মনিটরিং জোরদার করে এবং মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে নতুন ফসল বাজারে আসার আগেই দামের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।”

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে এখনও অন্তত তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। তার আগে যদি আমদানি অনুমতি না দেওয়া হয় বা পর্যাপ্ত নজরদারি না বাড়ানো হয়, তাহলে দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে বাজার আবারও স্থিতিশীল হতে পারে বলে তাদের মত।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

এদিকে সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, একের পর এক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজধানীর মালিবাগের এক গৃহিণী বলেন, “পেঁয়াজ ছাড়া রান্না কল্পনাই করা যায় না। এখন এক কেজি কিনতে ১২০ টাকা দিতে হচ্ছে—এটা একেবারেই অযৌক্তিক।”

মৌসুমি সংকট, আমদানি স্থগিত এবং বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট—এই তিন কারণ মিলেই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। সরকার এখন যদি দ্রুত আমদানির অনুমতি দেয়, বাজার তদারকি জোরদার করে এবং মজুদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। অন্যথায়, পেঁয়াজের এই অগ্নিমূল্য আরও কিছুদিন জ্বালিয়ে যেতে পারে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরকে।