সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয় নারী ক্রিকেট দলে যৌন হয়রানির অভিযোগ: তদন্ত কমিটি গঠন করল বিসিবি

ইকবাল মোল্লা
  • Update Time : ১০:১৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২১৯ Time View

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম জাতীয় দলে খেলার সময় নিজের প্রতি যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) এক ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, দলের সাবেক নির্বাচক মনজুরুল ইসলাম এবং নারী ক্রিকেট বিভাগের সাবেক ইনচার্জ প্রয়াত তৌহিদ মাহমুদ তাঁর প্রতি যৌন হয়রানির আচরণ করেছিলেন। জাহানারার দাবি, এই ঘটনাগুলোর পাশাপাশি তাঁর ক্যারিয়ার ধ্বংসে ভূমিকা রেখেছেন দলের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কোচিং স্টাফ এবং নারী ক্রিকেটের কিছু খেলোয়াড়ও।

জাহানারার এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টায় পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি জানায়, জাতীয় নারী দলের এক সাবেক সদস্যের অভিযোগে দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অসদাচরণের বিষয় উল্লেখ রয়েছে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তদন্তযোগ্য।

বিসিবি তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর প্রকৃতি ও গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কমিটি আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শেষে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দেবে। বোর্ডের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, “আমরা খেলোয়াড় ও কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও পেশাদার কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে, এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) জাহানারার পাশে দাঁড়িয়েছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা এই অভিযোগগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা বা কালক্ষেপণের সুযোগ দেওয়া যাবে না। কোয়াব বলেছে, “যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নারী ক্রিকেটের সব স্তরে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।”

এর আগে জাহানারা আলম একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বর্তমান অধিনায়ক নিগার সুলতানার বিরুদ্ধেও নানা ধরনের অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগ তুলেছিলেন। তখন বিসিবি সেই অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তবে এবার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে যৌন হয়রানির অভিযোগ হিসেবে উঠে আসায় তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

২০১১ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় জাহানারার। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পেসার হিসেবে তিনি দলের নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সর্বশেষ তিনি ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

জাহানারার এই অভিযোগ বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে থাকা নারী দলের অভ্যন্তরীণ সংকট, দলীয় রাজনীতি, ও কোচিং স্টাফদের প্রভাব এখন আবারও প্রশ্নের মুখে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত শুধু জাহানারার ন্যায়বিচারের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে নিরাপত্তা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

ইকবাল মোল্লা

ইকবাল মোল্লা, একজন অভিজ্ঞ কলামিস্ট এবং সফল রাজনীতিবিদ, হোমল্যান্ড নিউজের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এখানে তিনি তার প্রখর বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োগ করেন, বিশেষ করে রাজনীতির উপর। আধুনিক সমস্যাগুলির গভীর বোঝাপড়া এবং বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ইকবালের কলামগুলো চিন্তাশীল পাঠকদের জন্য অপরিহার্য পাঠ্য হয়ে উঠেছে। তার সুনিপুণ ও আকর্ষণীয় লেখার শৈলী এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সমাহার তাকে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি সম্মানিত কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়াও, ইকবালের লেখার বহুমুখিতা প্রমাণিত হয়েছে বিভিন্ন বিষয় দক্ষতার সাথে হাতকর্ম করার মাধ্যমে। তার লেখা মাধ্যমে, ইকবাল জনগণের আলোচনাকে প্রভাবিত করে চলেছেন এবং আমাদের সময়ের জটিল সমস্যাগুলির গভীর বোঝাপড়ায় সাহায্য করছেন।

জাতীয় নারী ক্রিকেট দলে যৌন হয়রানির অভিযোগ: তদন্ত কমিটি গঠন করল বিসিবি

Update Time : ১০:১৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম জাতীয় দলে খেলার সময় নিজের প্রতি যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) এক ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, দলের সাবেক নির্বাচক মনজুরুল ইসলাম এবং নারী ক্রিকেট বিভাগের সাবেক ইনচার্জ প্রয়াত তৌহিদ মাহমুদ তাঁর প্রতি যৌন হয়রানির আচরণ করেছিলেন। জাহানারার দাবি, এই ঘটনাগুলোর পাশাপাশি তাঁর ক্যারিয়ার ধ্বংসে ভূমিকা রেখেছেন দলের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কোচিং স্টাফ এবং নারী ক্রিকেটের কিছু খেলোয়াড়ও।

জাহানারার এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টায় পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি জানায়, জাতীয় নারী দলের এক সাবেক সদস্যের অভিযোগে দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অসদাচরণের বিষয় উল্লেখ রয়েছে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তদন্তযোগ্য।

বিসিবি তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর প্রকৃতি ও গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কমিটি আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শেষে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দেবে। বোর্ডের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, “আমরা খেলোয়াড় ও কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও পেশাদার কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে, এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) জাহানারার পাশে দাঁড়িয়েছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা এই অভিযোগগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা বা কালক্ষেপণের সুযোগ দেওয়া যাবে না। কোয়াব বলেছে, “যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নারী ক্রিকেটের সব স্তরে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।”

এর আগে জাহানারা আলম একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বর্তমান অধিনায়ক নিগার সুলতানার বিরুদ্ধেও নানা ধরনের অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগ তুলেছিলেন। তখন বিসিবি সেই অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তবে এবার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে যৌন হয়রানির অভিযোগ হিসেবে উঠে আসায় তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

২০১১ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় জাহানারার। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পেসার হিসেবে তিনি দলের নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সর্বশেষ তিনি ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

জাহানারার এই অভিযোগ বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে থাকা নারী দলের অভ্যন্তরীণ সংকট, দলীয় রাজনীতি, ও কোচিং স্টাফদের প্রভাব এখন আবারও প্রশ্নের মুখে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত শুধু জাহানারার ন্যায়বিচারের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে নিরাপত্তা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।