ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই হামলা: ৪০৩ ছাত্রলীগ নেতাকে শোকজ, প্রশাসনের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
- Update Time : ১০:০৮:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৫৫ Time View

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই সংঘটিত সহিংস ঘটনার প্রায় চার মাস পর অবশেষে প্রশাসন বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত ওই ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মোট ৪০৩ জন নেতাকে ‘কারণ দর্শাও নোটিশ’ (শোকজ) দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শুরু হলো বলে মনে করছেন শিক্ষার্থী ও পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদ স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাদের আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জবাব দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না এলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে একতরফা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, “যাদের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে, তাদের সনদ বাতিলের জন্য আমরা সুপারিশ করবো। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট।” তিনি আরও জানান, নোটিশটি মঙ্গলবার থেকেই কার্যকর হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ক্যাম্পাসে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যানুসন্ধান কমিটি প্রথম দফায় ১২৮ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, মোট ৪০৩ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী বিভিন্নভাবে ওই সহিংসতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। তাদের সবাইকেই এখন কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটির প্রেক্ষাপটও কম নাটকীয় নয়। ১৫ জুলাই ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও অনুষদে সরকারবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। দাবি ছিল শিক্ষার স্বাধীন পরিবেশ, নিরপেক্ষ প্রশাসন, এবং ছাত্র রাজনীতিতে সহিংসতা বন্ধ করা। কিন্তু দুপুরের দিকে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের একাংশ অতর্কিত হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ক্যাম্পাসজুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে; টিএসসি, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, কার্জন হল ও বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় সংঘর্ষ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতৃত্ব। কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী ইনান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন, সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতসহ প্রায় সব হল ইউনিটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে শোকজ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত নামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
- স্যার এ. এফ. রহমান হলের সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম ও সম্পাদক মুনেম শাহরিয়ার মুন
- মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের আজহারুল ইসলাম মামুন
- শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের কামাল উদ্দীন রানা ও মিশাত সরকার
- হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের শহিদুল হক শিশির ও মোহাম্মদ হোসেন
- সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের তানভীর শিকদার
- বিজয় একাত্তর হলের সজীবুর রহমান ও আবু ইউনুস
- জগন্নাথ হলের কাজল দাস ও অতনু বর্মন
- সূর্যসেন হলের মারিয়াম জামান খান সোহান ও সিয়াম রহমান
- শহীদুল্লাহ হলের জাহিদুল ইসলাম ও শরীফ আহমেদ মুনিম
- অমর একুশে হলের এনায়েত এইচ মনন ও ইমদাদুল হক সোহাগ
- ফজলুল হক মুসলিম হলের আনোয়ার হোসেন নাঈম ও আবু হাসিব মুক্ত
এছাড়া ছাত্রী হলগুলোর নেতৃত্বেও শোকজের তালিকা পৌঁছেছে। রোকেয়া হলের সভাপতি অন্তরা দাস পৃথা ও সাধারণ সম্পাদক আতিকা বিনতে হোসাইন, শামসুন নাহার হলের খাদিজা আক্তার উর্মি ও নুসরাত রুবাইয়াত নীলা, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের কোহিনূর আক্তার রাখি ও সানজিনা ইয়াসমিন, বেগম সুফিয়া কামাল হলের পূজা কর্মকার ও রিমা আক্তার ডলি, এবং কুয়েত-মৈত্রী হলের সভাপতি রাজিয়া সুলতানা কথা ও সম্পাদক জান্নাতুল হাওয়া আঁখির নামও তালিকায় রয়েছে।
তবে তালিকায় একটি নাম অনুপস্থিত, যা নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। জিয়াউর রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম শান্তর নাম তালিকায় নেই। আবার আশ্চর্যের বিষয়, ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভার নাম সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা ছাত্র রাজনীতির আন্তঃসংযোগ ও সংঘবদ্ধতার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, “আমরা শুরু থেকেই চেয়েছিলাম—যারা নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের বিচার হোক। এখন প্রশাসনের পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই, তবে এটি যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত ক্যাম্পাস রাজনীতিতে একটি নতুন বার্তা দেবে। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগের আধিপত্য ও সহিংসতার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমালোচিত ছিল। এখন প্রশাসন যদি ন্যায়সংগতভাবে তদন্ত শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে, তবে তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহিংসতা রোধে মাইলফলক হতে পারে।
তবে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। দলীয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করছে এবং প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন এটি কেবল প্রশাসনিক চাপ মোকাবিলার একটি কৌশল, আবার কেউ বলছেন এটি সত্যিকার সংস্কারের সূচনা।
যেভাবেই দেখা হোক না কেন, ৪০৩ নেতাকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা। একদিকে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দৃঢ়তার প্রতীক, অন্যদিকে এটি ক্যাম্পাস রাজনীতির নৈতিক পুনর্বিবেচনারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যেই বোঝা যাবে—এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নাকি সত্যিই জবাবদিহিতার নতুন অধ্যায়।










