তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানোর প্রশ্নে প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন সংসদের ক্ষমতা খর্ব হবে কি না?
- Update Time : ০৭:৪২:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৪৩ Time View

বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রশ্নে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এখন চলছে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিতর্ক। বুধবার (২২ অক্টোবর) প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে তিনি একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন—
“যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদালতের রায়ের মাধ্যমে ফিরে আসে, তবে কি সেটি সংসদের সাংবিধানিক ক্ষমতা খর্ব করবে না?”
এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে প্রধান বিচারপতি ইঙ্গিত দেন, আদালত শুধু রাজনৈতিক দাবির প্রেক্ষিতে নয়, বরং সাংবিধানিক ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোর ওপরও রায়ের প্রভাব বিবেচনা করছে।
আদালতে উত্তপ্ত শুনানি
বুধবারের শুনানিতে নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে মোট ১২ জন বিচারপতি শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে আটজন এই ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কেবল চারজন, যার মধ্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকও রয়েছেন, এর বিপক্ষে ছিলেন।
ড. ভূঁইয়া যুক্তি দেন যে, আদালত চাইলে জনগণের আস্থার স্বার্থে এই ব্যবস্থার পুনর্বহালের জন্য একটি গাইডলাইন বা সাংবিধানিক নির্দেশনা দিতে পারেন, যা ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করবে।
প্রধান বিচারপতি রেফাত আহমেদ বলেন, “এই মামলা এখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলা। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত আপিল শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো মামলার শুনানি গ্রহণ করা হবে না।”
পটভূমি: এক যুগের বিতর্কের পুনরাবির্ভাব
এর আগের দিন (২১ অক্টোবর) শুরু হয় এ মামলার প্রথম দিনের শুনানি। উল্লেখযোগ্যভাবে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের (৫ আগস্ট ২০২৪) পর থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এর পর ২৭ আগস্ট সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক—তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান—আপিল বিভাগের ২০১১ সালের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।
পরবর্তীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৬ অক্টোবর একই রায়ের পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। আর ২৩ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামী-র সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আলাদা করে রিভিউ আবেদন দাখিল করেন। ফলে বিষয়টি এখন জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে সর্বাধিক আলোচিত সাংবিধানিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ইতিহাস: বৈধতা থেকে বাতিল পর্যন্ত
১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, যা দেশের তিনটি জাতীয় নির্বাচন (১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮) সফলভাবে পরিচালনা করে। কিন্তু ২০১১ সালে আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে এই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে।
এর আগে ১৯৯৮ সালে অ্যাডভোকেট এম সলিম উল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন। হাইকোর্ট ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রিট খারিজ করে এটিকে বৈধ ঘোষণা করে। কিন্তু ২০০৫ সালে আপিল বিভাগে আপিল হলে আদালত আটজন অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) নিয়োগ করে।
এই আটজনের মধ্যে ড. কামাল হোসেন, টিএইচ খান, মাহমুদুল ইসলাম, এম আমীর-উল ইসলাম ও রোকনউদ্দিন মাহমুদ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। অপরদিকে, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি এর বিপক্ষে মত দেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক ও ড. এম জহির তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকায়নের প্রস্তাব দেন। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও এটি বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেন।
পরিশেষে ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ রায় দিয়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। এরপর ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয় এবং ৩ জুলাই গেজেট প্রকাশিত হয়। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়।
বর্তমান বাস্তবতা: নতুন রাজনৈতিক পরিসর
এই রায়ের পরবর্তী সময়েই তিনটি জাতীয় নির্বাচন—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়, যা নিয়ে বিরোধী দলগুলো সবসময়ই নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলেছে। এখন আদালতে পুনর্বিবেচনার এই শুনানি বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধান বিচারপতির উত্থাপিত প্রশ্ন—“তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরলে সংসদের ক্ষমতা খর্ব হবে কি না”—এটি শুধু আইনি নয়, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নও বটে। আদালতের চূড়ান্ত রায় তাই হতে পারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের নতুন মোড় ঘোরানোর সূচনা।










