‘চারতলা থেকে ঝাঁপ না দেওয়ায় ছয় গুলি’— রামপুরায় মানবতাবিরোধী অপরাধ
- Update Time : ০৫:০৩:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৮০ Time View

গত বছরের ১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরায় একজন তরুণকে ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা অবস্থায় গুলি করে জখম করার এবং দু’জনকে হত্যা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল-১ (বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ) মামলার প্রথম দিনের জবানবন্দিতে ঘটনাস্থলে থাকা ও গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি আমির হোসেন মর্মান্তিক ও বর্ণনামূলকভাবে নিজের অভিজ্ঞতা শোনান।
ঘটনার বিবরণে আমির বলেন, ‘‘সেই দিনে (১৯ জুলাই) আমি আফতাবনগরের ‘মামা কফি শপ’-এ কর্মরত ছিলাম। জুম্মার নামাজ শেষে দোকান থেকে বাসায় ফেরার পথে, রামপুরার মেরাদিয়া এলাকায় পৌঁছে দেখি সেখানকার প্রধান সড়কে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা আন্দোলনরত সাধারণ জনগণ ও শিক্ষার্থীদের উপর গুলি চালাচ্ছে। গুলির শব্দে আমি আতঙ্কিত হয়ে পাশের একটি নির্মাণাধীন চারতলা ভবনের ছাদে উঠে আশ্রয় নিই।’’ তিনি জানান, পুলিশ উপস্থিতি দেখে তিনি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা অবস্থায় নিরাপদ থাকার চেষ্টা করছিলেন।
সেদিন ছাদের ওপর তিনজন পুলিশ তাকে অনুসরণ করে উঠে আসে—অবস্থানটা ভয়াবহ ছিল। আমির বর্ণনা করেন, ‘‘একজন পুলিশ আমাকে বললেন নিচে ঝাঁপ দাও। আমি ঝাঁপ দেওয়ার বদলে কার্নিশের সঙ্গে রড ধরে ঝুলে থেকে আশ্রয় নিলাম। তখনই সেই পুলিশ সদস্য পিস্তল বের করে আমার পায়ের দিকে পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালায়। ওই তিন গুলি আমার পায়ের উপর পড়লে তিনি চলে যান। পরে আর একজন এসে আমার উপরে আরও তিন রাউন্ড গুলি করে—সেগুলোও আমার দুই পায়ে লাগে। এরপর আমি মাটিতে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারাই।’’ জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, গুলিবিদ্ধ হয়ে জ্ঞান ফিরলে নিজেকে ফেমাস হাসপাতালে দেখতে পান, যেখানে ডাক্তারেরা তার গুলিবিদ্ধ পায়ের ক্ষত স্থাপন করে সেলাই ও ব্যান্ডেজ দেন।
চিকিৎসার দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য অধ্যায় সম্পর্কে আমির বলেন, ‘‘কতগুলো হাসপাতালে ভর্তির মধ্য দিয়ে আমি গেলাম—প্রথমে ফেমাস, এরপর সন্ধ্যায় আমার ফুফু এসে আমাকে দেখে অবস্থা খারাপ হওয়ায় রাত ১২টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে তিন দিন ভর্তি থাকি। সেখান থেকে পরিপূর্ণ চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ি ফিরে বনশ্রী এলাকার ফরাজী হাসপাতালে চিকিৎসা নিই। পরে আমার ক্ষতের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে ছাত্ররা জানতে পেরে আমাকে টঙ্গী আহসানিয়া হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করায়। এক সপ্তাহ পর আমাকে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে নেওয়া হয়—কারণ গুলিতে আমার পায়ের রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়েছিল। সেখানে সফলভাবে আরেকটি অপারেশন করা হয় এবং আমি এক মাস চিকিৎসাধীন থাকি। এরপর আমাকে সাভারের সিআরপি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে তিন-চার মাস ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন চালিয়ে যেতে হয়েছে; এখনও মাঝে মাঝে আমাকে সেখানে যেতে হয়।’’
শারীরিক কস্টের পাশাপাশি মানসিক অস্থিরতার কথাও আমির জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘‘গোলমেলে আতঙ্কে আমি বহু দিন শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল ছিলেন। এখনো আমার পায়ের আঙ্গুল পুরোপুরি সচল নয়—পেশীর ক্রিয়া সীমিত। চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজ কষ্টসাধ্য হয়েছে।’’
বিচারে তিনি পুলিশ সদস্যদের নাম উল্লেখ করে বলেন, পরবর্তীতে তিনি জানতে পেরেছেন রামপুরা থানার ওসি, এএসআই চঞ্চল ও এসআই তরিকুলই তাকে গুলি করেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘এএসআই চঞ্চল ধরা পড়েছেন, কিন্তু এসআই তরিকুল পালিয়ে গেছেন। যারা বিনা কারণে আমাকে গুলি করেছে তাদের বিচার ও সুষ্ঠু শাস্তি আমি চাই।’’ আমির আদালতের প্রতি আদালতের ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, যারা অপরাধ করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিক যাতে ভবিষ্যতে এমন মানবতাবিরোধী আচরণ কেউ পুনরাবৃত্তি করতে না পারে।
এ ঘটনার সামাজিক প্রেক্ষাপটও উল্লেখযোগ্য—জবানবন্দিতে আমির বলছেন, যে ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে তা জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং স্থানীয় ছাত্র সমাবেশ ও সাংবাদিকদের সহায়তায় তার চিকিৎসা ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সাহায্য-সুবিধা কিছুটা সুনিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে, ঘটনা জাতির সামনের একটি বড় মানবাধিকার বিষয় তুলে ধরে—নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নাগরিকদের উপর অযথা নির্বিচার সহিংসতার প্রশ্ন।
ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দি ঘটনায় নতুন আলোকপাত তৈরি করেছে—এখানে যেখানে ভুক্তভোগী তার জীবনের কষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক প্রতিকূলতা ও বিচার চাওয়ার স্পষ্ট দাবি ব্যক্ত করেছেন, সেখানে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম, অভিযুক্তদের স্থিতি ও সরকারিভাবে নেয়া ব্যবস্থা নিয়ে সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং প্রশ্নগুলোও জাগছে। আমিরের অনুরোধ, আইনগত প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হোক, যাতে ন্যায়বিচার লাভ করে ভুক্তভোগী ও একই সাথে মানুষের প্রতি নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বশীল আচরণও নিশ্চিত করা যায়।
শেষে, আদালতে উপস্থাপিত আমির হোসেনের জবানবন্দি থেকে স্পষ্ট যে—ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির শারীরিক আঘাত নিয়ে নয়; এটি মানুষের জীবন, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন, যার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি জরুরি।










