সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রিজনভ্যানে ট্রাইব্যুনাল ছাড়লেন ১৫ সেনা কর্মকর্তা!

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:৫৩:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১৪২ Time View

344b91c1064ae7d8f8735d5d33ebeaf1 68f86c9d9ab64

344b91c1064ae7d8f8735d5d33ebeaf1 68f86c9d9ab64

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে বুধবার (২২ অক্টোবর ২০২৫) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সকাল থেকেই পুরাতন হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত ট্রাইব্যুনাল এলাকায় ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সশস্ত্র বাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় নিরাপত্তা বলয়ে।

সকাল সোয়া ৭টার দিকে ‘বাংলাদেশ জেল-প্রিজন ভ্যান’ লেখা সবুজ রঙের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রিজনভ্যানে এই ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে আদালতে আনা হয়। পরে সকাল ১০টা ১০ মিনিটে শুনানি শেষে একই প্রিজনভ্যানে করে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। সেনা কর্মকর্তাদের বহনে ব্যবহৃত এই বিশেষ প্রিজনভ্যানটি ছিল সম্পূর্ণ এসি-সুবিধাসম্পন্ন এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত, যা সাধারণ আসামি পরিবহনের গাড়ি থেকে অনেকটাই আলাদা।

এদিন সকাল ৮টার পর থেকে পৃথক তিন মামলার ওপর শুনানি শুরু হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম উপস্থিত থেকে শুনানি পরিচালনা করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার এবং সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদঅবসরপ্রাপ্ত জেলা দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “আজ তিনটি মামলার মোট ১৫ আসামিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ট্রাইব্যুনালে হাজির করেছে। এর মধ্যে র‍্যাবের টিএফআই সেলে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের মামলায় ১৭ আসামির ১০ জনকে আনা হয়। ট্রাইব্যুনাল তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।”

তিনি আরও জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের হাজির হওয়ার জন্য দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল, যা আগামী ৭ দিনের মধ্যে— অর্থাৎ ২৯ অক্টোবরের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। এছাড়া এই মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ নভেম্বর ২০২৫

অন্যদিকে, জয়েন্ট ইন্টারোগেশন

সেল (জেআইসি)-এ সংঘটিত গুমের অভিযোগে দায়ের করা আরেক মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে তিনজনকে আজ আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধেও একই আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল এবং পলাতকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন।

এর আগে সকাল ৭টার পরপরই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রাজধানীর পুরাতন হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে পৌঁছে যায় ১৫ সেনা কর্মকর্তাবাহী প্রিজনভ্যানটি। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই তিন মামলায় মোট আসামি ৩২ জন, যাঁদের মধ্যে ২৫ জনই সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা। এর মধ্যে ১৫ জন বর্তমানে সেনা হেফাজতে রয়েছেন এবং আজ তাঁদের আদালতে হাজির করা হয়।

ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন:
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, মেজর জেনারেল মোস্তফা সরোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম, কর্নেল মশিউল রহমান জুয়েল, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন, মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, মেজর জেনারেল কবির আহম্মেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মখচুরুল হক (অবসরপ্রাপ্ত), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার কর্নেল কে এম আজাদ।

অভিযোগ অনুযায়ী, এদের মধ্যে অনেকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে টিএফআই (Task Force for Interrogation)জেআইসি (Joint Interrogation Cell)-এর গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে গুম, খুন, এবং নির্যাতনের মতো অপরাধে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এছাড়া জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত একাধিক মানবতাবিরোধী ঘটনার সঙ্গেও তাঁদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এত সংখ্যক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে একই দিনে আদালতে হাজির ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ। এটি সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব ও সামরিক প্রশাসনের মধ্যকার সম্পর্কের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

বিকেলে রাজধানীজুড়ে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে বাড়তি নিরাপত্তা জারি করা হয়। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আবারও আলোচনায় এসেছে—বিশেষ করে যখন অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, যাঁরা এক সময় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রিজনভ্যানে ট্রাইব্যুনাল ছাড়লেন ১৫ সেনা কর্মকর্তা!

Update Time : ১১:৫৩:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫

344b91c1064ae7d8f8735d5d33ebeaf1 68f86c9d9ab64

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে বুধবার (২২ অক্টোবর ২০২৫) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সকাল থেকেই পুরাতন হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত ট্রাইব্যুনাল এলাকায় ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সশস্ত্র বাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় নিরাপত্তা বলয়ে।

সকাল সোয়া ৭টার দিকে ‘বাংলাদেশ জেল-প্রিজন ভ্যান’ লেখা সবুজ রঙের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রিজনভ্যানে এই ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে আদালতে আনা হয়। পরে সকাল ১০টা ১০ মিনিটে শুনানি শেষে একই প্রিজনভ্যানে করে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। সেনা কর্মকর্তাদের বহনে ব্যবহৃত এই বিশেষ প্রিজনভ্যানটি ছিল সম্পূর্ণ এসি-সুবিধাসম্পন্ন এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত, যা সাধারণ আসামি পরিবহনের গাড়ি থেকে অনেকটাই আলাদা।

এদিন সকাল ৮টার পর থেকে পৃথক তিন মামলার ওপর শুনানি শুরু হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম উপস্থিত থেকে শুনানি পরিচালনা করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার এবং সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদঅবসরপ্রাপ্ত জেলা দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “আজ তিনটি মামলার মোট ১৫ আসামিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ট্রাইব্যুনালে হাজির করেছে। এর মধ্যে র‍্যাবের টিএফআই সেলে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের মামলায় ১৭ আসামির ১০ জনকে আনা হয়। ট্রাইব্যুনাল তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।”

তিনি আরও জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের হাজির হওয়ার জন্য দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল, যা আগামী ৭ দিনের মধ্যে— অর্থাৎ ২৯ অক্টোবরের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। এছাড়া এই মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ নভেম্বর ২০২৫

অন্যদিকে, জয়েন্ট

ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি)-এ সংঘটিত গুমের অভিযোগে দায়ের করা আরেক মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে তিনজনকে আজ আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধেও একই আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল এবং পলাতকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন।

এর আগে সকাল ৭টার পরপরই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রাজধানীর পুরাতন হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে পৌঁছে যায় ১৫ সেনা কর্মকর্তাবাহী প্রিজনভ্যানটি। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই তিন মামলায় মোট আসামি ৩২ জন, যাঁদের মধ্যে ২৫ জনই সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা। এর মধ্যে ১৫ জন বর্তমানে সেনা হেফাজতে রয়েছেন এবং আজ তাঁদের আদালতে হাজির করা হয়।

ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন:
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, মেজর জেনারেল মোস্তফা সরোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম, কর্নেল মশিউল রহমান জুয়েল, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন, মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, মেজর জেনারেল কবির আহম্মেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মখচুরুল হক (অবসরপ্রাপ্ত), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার কর্নেল কে এম আজাদ।

অভিযোগ অনুযায়ী, এদের মধ্যে অনেকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে টিএফআই (Task Force for Interrogation)জেআইসি (Joint Interrogation Cell)-এর গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে গুম, খুন, এবং নির্যাতনের মতো অপরাধে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এছাড়া জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত একাধিক মানবতাবিরোধী ঘটনার সঙ্গেও তাঁদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এত সংখ্যক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে একই দিনে আদালতে হাজির ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ। এটি সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব ও সামরিক প্রশাসনের মধ্যকার সম্পর্কের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

বিকেলে রাজধানীজুড়ে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে বাড়তি নিরাপত্তা জারি করা হয়। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আবারও আলোচনায় এসেছে—বিশেষ করে যখন অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, যাঁরা এক সময় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।