আটক বলা হলে অবশ্যই ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে আদালতে আনতে হবে: চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম
- Update Time : ০৫:১৪:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৯১ Time View

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি বলা হয় যে ১৫ জন সেনা কর্মকর্তা আটক আছেন, তবে আইন অনুযায়ী তাঁদের অবশ্যই আদালতে হাজির করতে হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলায় ট্রাইব্যুনাল থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর যেসব কর্মকর্তা বর্তমানে সেনাবাহিনীর হেফাজতে আছেন, তাঁদের বিষয়ে আজ রোববার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
গতকাল শনিবার সেনাসদর এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, অভিযুক্ত ২৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন এখনো চাকরিতে আছেন, এবং তাঁদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আজ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ডকুমেন্ট আসেনি যে তাঁরা আটক। মিডিয়াতে যা এসেছে, তা আমরা আনুষ্ঠানিক তথ্য হিসেবে গণ্য করতে পারি না। তবে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে তাঁরা আটক আছেন, তাহলে আইন অনুযায়ী তাঁদের আদালতে হাজির করতেই হবে—এটাই সংবিধান ও আইনের বিধান।”
তিনি আরও বলেন, “সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে স্পষ্ট বলা আছে—যেখানেই কেউ গ্রেপ্তার হোন না কেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের সামনে হাজির করা বাধ্যতামূলক। আদালতের অনুমতি ছাড়া ২৪ ঘণ্টার বেশি কাউকে আটক রাখা যায় না। আদালতই তখন সিদ্ধান্ত নেবেন, আটক রাখবেন না জামিন দেবেন।”
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে আসামিকে আটক রাখার সিদ্ধান্ত আদালতই নেবে। কাউকে যদি আটক রাখা হয়, সেটা আদালতের আদেশে হতে হবে, কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে নয়। আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হলে তাঁদের অবশ্যই আদালতের সামনে হাজির করতে হবে।”
সেনাসদরের পক্ষ থেকে গতকাল অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান জানিয়েছেন, ১৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৪ জন বর্তমানে চাকরিতে আছেন এবং একজন অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) রয়েছেন। তিনি আরও জানান, সেনাবাহিনী ন্যায়বিচারের পক্ষে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
প্রসঙ্গত, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত দুটি গুম-নির্যাতনের মামলা এবং গত জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ৮ অক্টোবর ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এরপরই এই ইস্যু দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয় এবং গ্রেপ্তারের দাবিতে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ বাড়ে।
এ প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, “যাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, তাঁদের বিষয়ে সেনাবাহিনী সংবাদ সম্মেলন করলেও ট্রাইব্যুনালকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। আমাদের কাছে কেউ ব্যাখ্যা চাননি। যদি চান, তখন আমরা আইন অনুযায়ী ব্যাখ্যা দেব।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ন্যায়বিচারের মূলনীতি হচ্ছে—আদালতই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। যদি সেনা কর্মকর্তাদের হেফাজতে রাখা হয়, তবে সেটি আদালতের নজরদারিতেই হতে হবে। কারণ আদালত ছাড়া কোনো সংস্থা কাউকে আটক রাখার ক্ষমতা রাখে না। সংবিধান এই নীতিকেই সর্বোচ্চ আইনি মর্যাদা দিয়েছে।”
আইনজীবী মহল বলছেন, চিফ প্রসিকিউটরের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, গ্রেপ্তার বা হেফাজতের বিষয়টি শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, বরং এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাই ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন বজায় রাখতে হলে সেনা কর্মকর্তাদের আদালতের মুখোমুখি করতেই হবে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন, যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়া যেন কোনোভাবেই বিলম্বিত না হয় এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা অটুট থাকে, সেটিই এখন সময়ের দাবি।
সর্বশেষ, চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম পুনর্ব্যক্ত করেন, “আমরা ন্যায়বিচারের পক্ষে। আদালতের আদেশই হবে চূড়ান্ত। যদি আটক বলা হয়, তবে তাঁদের আদালতে আনতেই হবে—এটাই সংবিধান ও আইনের নির্দেশ।”










