সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ২৯৯ কোটি টাকার কর কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৩ কোটি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১২:৪৫:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ১৯৩ Time View

63638cbd924a9eaabe3d0a804e15bd77 68ca4d2d72f68

63638cbd924a9eaabe3d0a804e15bd77 68ca4d2d72f68

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ইতিহাসে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ধরা পড়েছে, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের ২৯৯ কোটি টাকার নির্ধারিত আয়কর রহস্যজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৩ কোটি টাকায়। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, এই অস্বাভাবিক ছাড়ের পেছনে ঘুষের বিনিময়ে করা হয়েছে বড় ধরনের অনিয়ম। ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে এনবিআরের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অনিয়মের নেপথ্যে ঘুষ লেনদেন

গোয়েন্দা তদন্তে জানা গেছে, জোবাইদা করিম জুট মিলস লিমিটেডের দুই করবর্ষে মোট ২৯৯ কোটি টাকা আয়কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী আপিল করার পর ট্রাইব্যুনাল সংশোধিত কর নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলে পাঠায়। কিন্তু তখন নোয়াখালী কর অঞ্চলের পরিদর্শী রেঞ্জ-৩-এ দায়িত্বে থাকা যুগ্ম কর কমিশনার মো. জাহাঙ্গীর আলম কোম্পানির সঙ্গে গোপন সমঝোতায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি কর কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ নেন।

এরপর পদোন্নতি ও বদলির সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ফরিদপুর কর অঞ্চলের অতিরিক্ত সহকারী কর কমিশনার মোহাম্মদ মাসুদুর রহমানকে দিয়ে একটি নতুন অর্ডারশিট তৈরি করান। এতে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অমান্য করে ২৯৯ কোটি টাকার কর কমিয়ে মাত্র ৩৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাসুদুর রহমানও ঘুষের অংশ হিসেবে পান ৫ লাখ টাকা।

দ্রুত প্রক্রিয়া জালিয়াতি

তদন্তে উঠে এসেছে, মাত্র দুই দিনের মধ্যে ব্যাক ডেটে অর্ডারশিটে সই করা হয়। এতে কমিশনার বা সংশ্লিষ্ট রেঞ্জের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় গোপনে এবং আইনগত ধাপ উপেক্ষা করে। ফলে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৬৬ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

গোয়েন্দা তদন্তে এ অনিয়মের প্রমাণ মিললেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, “আমি কেবল জাহাঙ্গীর আলমের নির্দেশে অর্ডারশিট তৈরি করেছি, এর বাইরে আমি কিছু জানি না।” অন্যদিকে, জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং পাঠানো মেসেজেরও কোনো জবাব মেলেনি।

তদন্ত ব্যবস্থা

ঢাকা কর অঞ্চল-১৮-এর কমিশনার বিষয়টি নজরে এনে গোয়েন্দা তদন্তের নির্দেশ দেন। এনবিআরের গোয়েন্দা ইউনিট তদন্ত শেষে অনিয়মের ঘটনা নিশ্চিত করে। পরে এনবিআর কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়।

সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৫ ধারায় মো. জাহাঙ্গীর আলমকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর বিধি ১২ অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান। তবে বরখাস্তকালীন তিনি নিয়ম অনুযায়ী খোরপোশ ভাতা পাবেন।

দুর্নীতির সংস্কৃতির এক উদাহরণ

কর প্রশাসনে এ ধরনের ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে দুর্নীতি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাত্র ৩৫ লাখ টাকার ঘুষের বিনিময়ে সরকারের ২৬৬ কোটি টাকার রাজস্ব হারানো শুধু রাজস্ব খাতের জন্যই নয়, বরং পুরো অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে আরও কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে কর ফাঁকি ও দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

৩৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ২৯৯ কোটি টাকার কর কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৩ কোটি

Update Time : ১২:৪৫:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫

63638cbd924a9eaabe3d0a804e15bd77 68ca4d2d72f68

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ইতিহাসে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ধরা পড়েছে, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের ২৯৯ কোটি টাকার নির্ধারিত আয়কর রহস্যজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৩ কোটি টাকায়। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, এই অস্বাভাবিক ছাড়ের পেছনে ঘুষের বিনিময়ে করা হয়েছে বড় ধরনের অনিয়ম। ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে এনবিআরের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অনিয়মের নেপথ্যে ঘুষ লেনদেন

গোয়েন্দা তদন্তে জানা গেছে, জোবাইদা করিম জুট মিলস লিমিটেডের দুই করবর্ষে মোট ২৯৯ কোটি টাকা আয়কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী আপিল করার পর ট্রাইব্যুনাল সংশোধিত কর নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলে পাঠায়। কিন্তু তখন নোয়াখালী কর অঞ্চলের পরিদর্শী রেঞ্জ-৩-এ দায়িত্বে থাকা যুগ্ম কর কমিশনার মো. জাহাঙ্গীর আলম কোম্পানির সঙ্গে গোপন সমঝোতায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি কর কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ নেন।

এরপর পদোন্নতি ও বদলির সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ফরিদপুর কর অঞ্চলের অতিরিক্ত সহকারী কর কমিশনার মোহাম্মদ মাসুদুর রহমানকে দিয়ে একটি নতুন অর্ডারশিট তৈরি করান। এতে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অমান্য করে ২৯৯ কোটি টাকার কর কমিয়ে মাত্র ৩৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাসুদুর রহমানও ঘুষের অংশ হিসেবে পান ৫ লাখ টাকা।

দ্রুত প্রক্রিয়া জালিয়াতি

তদন্তে উঠে এসেছে, মাত্র দুই দিনের মধ্যে ব্যাক ডেটে অর্ডারশিটে সই করা হয়। এতে কমিশনার বা সংশ্লিষ্ট রেঞ্জের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় গোপনে এবং আইনগত ধাপ উপেক্ষা করে। ফলে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৬৬ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

গোয়েন্দা তদন্তে এ অনিয়মের প্রমাণ মিললেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, “আমি কেবল জাহাঙ্গীর আলমের নির্দেশে অর্ডারশিট তৈরি করেছি, এর বাইরে আমি কিছু জানি না।” অন্যদিকে, জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং পাঠানো মেসেজেরও কোনো জবাব মেলেনি।

তদন্ত ব্যবস্থা

ঢাকা কর অঞ্চল-১৮-এর কমিশনার বিষয়টি নজরে এনে গোয়েন্দা তদন্তের নির্দেশ দেন। এনবিআরের গোয়েন্দা ইউনিট তদন্ত শেষে অনিয়মের ঘটনা নিশ্চিত করে। পরে এনবিআর কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়।

সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৫ ধারায় মো. জাহাঙ্গীর আলমকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর বিধি ১২ অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান। তবে বরখাস্তকালীন তিনি নিয়ম অনুযায়ী খোরপোশ ভাতা পাবেন।

দুর্নীতির সংস্কৃতির এক উদাহরণ

কর প্রশাসনে এ ধরনের ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে দুর্নীতি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাত্র ৩৫ লাখ টাকার ঘুষের বিনিময়ে সরকারের ২৬৬ কোটি টাকার রাজস্ব হারানো শুধু রাজস্ব খাতের জন্যই নয়, বরং পুরো অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে আরও কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে কর ফাঁকি ও দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।