ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নির্বাহী সভায় দুদক মামলার আসামিদের দাওয়াত,IDRA চোখ বন্ধ!
- Update Time : ১০:১১:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / ২৭৯ Time View

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের নির্বাহী কমিটির ৫৭৭তম সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় সেই সব ব্যক্তিদের, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অর্থ আত্মসাতের মামলা পরিচালনা করছে। গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত এসব আসামিকে সভায় বিশেষ মর্যাদা দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এর পরও বিস্ময়করভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ (ইনস্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি) কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিপুল অঙ্কের তহবিল আত্মসাৎ মামলার আসামিরা এখনো নির্বাহী কমিটি ও বোর্ড সভাসহ বিভিন্ন কমিটির বৈঠকে অংশ নিয়ে সরাসরি কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করছেন। এর ফলে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আলোচিত প্রায় ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকার একটি টাকাও এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ স্পষ্ট নির্দেশনা দিলেও প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা পরিশোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এ পরিস্থিতি শুধু গ্রাহকের স্বার্থকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে না, বরং পুরো বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও স্থিতিশীলতায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নোটিশ সূত্রে জানা গেছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের নির্বাহী কমিটির ৫৭৭তম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে আজ বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায়। এই সভা আহ্বান সম্পর্কিত নোটিশ জারি করা হয়েছিল গত ১১ সেপ্টেম্বর। নিয়ম অনুযায়ী নির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা ৪ জন হলেও নোটিশে দেখা যায়, সভায় উপস্থিত থাকার জন্য মোট ৯ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জনকে “বিশেষ অতিথি” এবং আরও ২ জনকে “বিশেষভাবে আমন্ত্রিত” অতিথি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে এই সভাকে ঘিরে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সভায় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং দুদক মামলার আসামি নাজনীন হোসেনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, একই সঙ্গে বিশেষ অতিথি হিসেবে ডাকা হয় আরেক আসামি হেলাল মিয়াকে। শুধু তাই নয়, হেলাল মিয়ার ভাই মোবারক হোসেনকে “বিশেষভাবে আমন্ত্রিত” হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি নাজনীন হোসেনের স্বামী মোশাররফ হোসেনকেও বিশেষ অতিথি হিসেবে সভায় উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানানো হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই সভার সভাপতিত্ব করেন দুদক মামলার আরেক আসামি ডা. মনোয়ার এবং সভায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন ডা. মোজাম্মেল হোসেনের ভাই ডা. মো. মোকাদ্দেস হোসেন।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলার আসামিরা সরাসরি নির্বাহী কমিটির ৫৭৭তম সভায় উপস্থিত থেকেছেন। সভায় মোট ২৩টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—কোম্পানির আত্মসাতকৃত বিপুল অঙ্কের অর্থ উদ্ধার কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ—এসব বিষয়ে কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। এতে করে গ্রাহকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত থেকে যাওয়ার পাশাপাশি কোম্পানির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ জুলাই ২০২৫ তারিখে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি মামলা দায়ের করে। মামলাটি নং–৩৫, তারিখ ৩১/০৭/২০২৫, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ রেকর্ডভুক্ত হয়। এ মামলার বাদী ছিলেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দ আতাউল কবির। মামলায় কোম্পানির ১৪ জন পরিচালকসহ মোট ২৪ জনকে আসামি করা হয়।
এই মামলার ২ নম্বর আসামি ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক পরিচালক আলহাজ মো. হেলাল মিয়ার সঙ্গে পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার ভাই মো. মোবারক হোসেন বর্তমানে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে ‘নিরপেক্ষ পরিচালক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, মোবারক হোসেন হেলাল মিয়ার মালিকানাধীন আমানত শাহ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্বে আছেন, যা সরাসরি স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।
বীমা খাতের করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের ৬.৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনোভাবেই পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারেন না। সে অনুযায়ী, মো. মোবারক হোসেনের বর্তমান অবস্থান কেবল নীতিমালা লঙ্ঘনের উদাহরণই নয়, বরং নৈতিক প্রশ্নও তৈরি করেছে—কীভাবে মামলার ২ নম্বর আসামির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হয়েও তিনি নিরপেক্ষ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মামলার ৪ নম্বর আসামি নাজনীন হোসেন বর্তমানে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জানা গেছে, যে জমি ক্রয়ের মাধ্যমে কোম্পানির বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছিল, সেই জমি ক্রয় কমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। অর্থাৎ, আত্মসাতের মূল প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এমন অবস্থায় নাজনীন হোসেনের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে থাকা বীমাকারীর করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তবুও ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নির্বাহী কমিটির ৫৭৭তম সভায় তাকে উপস্থিত থাকার জন্য নোটিশ প্রদান করা হয়। শুধু তাই নয়, তার স্বামী মোশারফ হোসেনকেও বিশেষ অতিথি হিসেবে ওই সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, নাজনীন হোসেন কাগজে-কলমে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হলেও প্রকৃতপক্ষে তার স্বামী মোশারফ হোসেন নিয়মিতভাবে কোম্পানির সভায় উপস্থিত থাকেন এবং বিভিন্ন কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এর মাধ্যমে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা ব্যবহার করছেন, যা কেবল করপোরেট গভর্ন্যান্স নীতিরই নয়, বরং বিদ্যমান বীমা আইনেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
দুদকের দায়ের করা মামলার ৬ নম্বর আসামি মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা. মো. মনোয়ার হোসেন এবং ১১ নম্বর আসামি মোজাম্মেল হোসেন—দু’জনই ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ডা. মো. মোকাদ্দেস হোসেনের বড় ভাই। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মামলার আসামিদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হয়েও ডা. মোকাদ্দেস হোসেন নির্বাহী কমিটির ৫৭৭তম সভায় সভাপতির আসনে বসেন এবং কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন।
এই পরিস্থিতি বীমাকারীর করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের ৬.৫ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ নীতিমালা অনুযায়ী, স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা আসামিদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচালনা পর্ষদ বা নির্বাহী কমিটির দায়িত্ব পালনের কোনো বৈধতা থাকে না। অথচ বাস্তবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফে এই বিধান উপেক্ষা করে আসামিদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কেই সভার সভাপতিত্ব করতে দেওয়া হয়েছে, যা কোম্পানির সুশাসন ও গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় চরম প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।










