সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হিদায়াত, তাকওয়া, আফাফ ও গিনা – জীবনের সফলতার চার মূল স্তম্ভ

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১১:২১:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ২২৬ Time View

1634866387.Doa of not poorness

1634866387.Doa of not poorness

আল্লাহ্‌ তা’আলার প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করার পর—আজকের আলোচনার বিষয় হলো একটি মহামূল্যবান দোয়া, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে চাই হিদায়াত, তাকওয়া, পবিত্রতা এবং অভাবমুক্তি।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৭২১)

এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ দোয়াটির ভেতর দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার সবকিছু নিহিত রয়েছে।

. হিদায়াত (সঠিক পথপ্রাপ্তি)

হিদায়াত মানে শুধু মুসলমান হয়ে জন্ম নেওয়া নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করা।

আল্লাহ বলেন:

“নিশ্চয়ই এ কুরআন সেই পথ প্রদর্শন করে, যা সবচেয়ে সঠিক।”
(সূরা আল-ইসরা, ১৭:৯)

রাসূল ﷺ প্রতিটি নামাযে সূরা ফাতিহার মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন—
اهدِنَا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ
আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত কর। (সূরা ফাতিহা, ১:৬)

অতএব, আমাদের জীবনের মূল কামনা হওয়া উচিত সঠিক পথের প্রতি অটল থাকা।

. তাকওয়া (আল্লাহভীতি)

তাকওয়া হলো আল্লাহকে ভয় করা, হারাম থেকে বিরত থাকা এবং ফরজ আদায় করা। তাকওয়াই মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে।

আল্লাহ বলেন:

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বেশি তাকওয়া অবলম্বন করে, সে-ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান।”
(সূরা হুজরাত, ৪৯:১৩)

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“যেখানে-ই থাক না কেন, আল্লাহকে ভয় করো।”
(তিরমিজি, হাদিস নং ১৯৮৭)

তাকওয়া ছাড়া মানুষের কোনো আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।

. আফাফ (পবিত্রতা সংযম)

আফাফ মানে হলো নফসের খারাপ চাহিদা দমন করা, হারাম কামনা থেকে বাঁচা এবং চরিত্রকে পরিশুদ্ধ রাখা।

আল্লাহ বলেন:

“যারা বিবাহ করতে সক্ষম নয়, তারা যেন পবিত্র থাকে, যতক্ষণ না আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহে সমৃদ্ধ করেন।”
(সূরা আন-নূর, ২৪:৩৩)

রাসূল ﷺ যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন:

“হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহ করতে সক্ষম, সে যেন বিবাহ করে। আর যে সক্ষম নয়, সে যেন রোজা রাখে; কেননা রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫০৬৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪০০)

আজকের যুগে অশ্লীলতা, পর্নোগ্রাফি ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে বাঁচতে আফাফের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।

. গিনা (অভাবমুক্তি অন্তরের তৃপ্তি)

এখানে গিনা বলতে শুধু ধনসম্পদের প্রাচুর্য নয়, বরং অন্তরের ধনকেও বোঝানো হয়েছে।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“আসল ধনী সে-ই, যে অন্তরে পরিতৃপ্ত।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৪৪৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৫১)

আল্লাহ বলেন:

“আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তাঁর জন্য তিনিই যথেষ্ট।”
(সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩)

আমরা যদি আল্লাহর দেয়া রিজিকের উপর সন্তুষ্ট থাকি, তবে অন্তরের অভাব দূর হবে এবং শান্তি আসবে।

বাস্তব জীবনে প্রয়োগ

  • আমাদের প্রতিদিনের দোয়ার মধ্যে এই দোয়াটি রাখা উচিত।
  • নামায শেষে এবং বিশেষ করে তাহাজ্জুদের সময়ে এই দোয়াটি পড়লে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়।
  • সন্তানদেরও এই দোয়াটি শিখানো দরকার, যাতে তাদের জীবন সঠিক পথে পরিচালিত হয়।
  • সমাজে যদি এই চারটি গুণ ছড়িয়ে পড়ে, তবে দুর্নীতি, অশ্লীলতা, লোভ ও গরিবি অনেকটাই কমে যাবে।

 

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
এই দোয়ায় আমরা শিখি যে মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন হলো হিদায়াত, তাকওয়া, পবিত্রতা এবং অন্তরের তৃপ্তি। এগুলো অর্জিত হলে দুনিয়ার সুখ ও আখিরাতের মুক্তি দুটোই পাওয়া যায়।

আসুন, আমরা সকলে আন্তরিকভাবে এই দোয়াটি মুখস্থ করি এবং আল্লাহর কাছে সর্বদা এ চারটি নিয়ামত প্রার্থনা করি—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى

আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই দোয়ার বরকতে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করুন। আমিন।

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

হিদায়াত, তাকওয়া, আফাফ ও গিনা – জীবনের সফলতার চার মূল স্তম্ভ

Update Time : ১১:২১:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

1634866387.Doa of not poorness

আল্লাহ্‌ তা’আলার প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করার পর—আজকের আলোচনার বিষয় হলো একটি মহামূল্যবান দোয়া, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে চাই হিদায়াত, তাকওয়া, পবিত্রতা এবং অভাবমুক্তি।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৭২১)

এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ দোয়াটির ভেতর দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার সবকিছু নিহিত রয়েছে।

. হিদায়াত (সঠিক পথপ্রাপ্তি)

হিদায়াত মানে শুধু মুসলমান হয়ে জন্ম নেওয়া নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করা।

আল্লাহ বলেন:

“নিশ্চয়ই এ কুরআন সেই পথ প্রদর্শন করে, যা সবচেয়ে সঠিক।”
(সূরা আল-ইসরা, ১৭:৯)

রাসূল ﷺ প্রতিটি নামাযে সূরা ফাতিহার মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন—
اهدِنَا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ
আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত কর। (সূরা ফাতিহা, ১:৬)

অতএব, আমাদের জীবনের মূল কামনা হওয়া উচিত সঠিক পথের প্রতি অটল থাকা।

. তাকওয়া (আল্লাহভীতি)

তাকওয়া হলো আল্লাহকে ভয় করা, হারাম থেকে বিরত থাকা এবং ফরজ আদায় করা। তাকওয়াই মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে।

আল্লাহ বলেন:

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বেশি তাকওয়া অবলম্বন করে, সে-ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান।”
(সূরা হুজরাত, ৪৯:১৩)

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“যেখানে-ই থাক না কেন, আল্লাহকে ভয় করো।”
(তিরমিজি, হাদিস নং ১৯৮৭)

তাকওয়া ছাড়া মানুষের কোনো আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।

. আফাফ (পবিত্রতা সংযম)

আফাফ মানে হলো নফসের খারাপ চাহিদা দমন করা, হারাম কামনা থেকে বাঁচা এবং চরিত্রকে পরিশুদ্ধ রাখা।

আল্লাহ বলেন:

“যারা বিবাহ করতে সক্ষম নয়, তারা যেন পবিত্র থাকে, যতক্ষণ না আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহে সমৃদ্ধ করেন।”
(সূরা আন-নূর, ২৪:৩৩)

রাসূল ﷺ যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন:

“হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহ করতে সক্ষম, সে যেন বিবাহ করে। আর যে সক্ষম নয়, সে যেন রোজা রাখে; কেননা রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫০৬৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪০০)

আজকের যুগে অশ্লীলতা, পর্নোগ্রাফি ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে বাঁচতে আফাফের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।

. গিনা (অভাবমুক্তি অন্তরের তৃপ্তি)

এখানে গিনা বলতে শুধু ধনসম্পদের প্রাচুর্য নয়, বরং অন্তরের ধনকেও বোঝানো হয়েছে।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“আসল ধনী সে-ই, যে অন্তরে পরিতৃপ্ত।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৪৪৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৫১)

আল্লাহ বলেন:

“আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তাঁর জন্য তিনিই যথেষ্ট।”
(সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩)

আমরা যদি আল্লাহর দেয়া রিজিকের উপর সন্তুষ্ট থাকি, তবে অন্তরের অভাব দূর হবে এবং শান্তি আসবে।

বাস্তব জীবনে প্রয়োগ

  • আমাদের প্রতিদিনের দোয়ার মধ্যে এই দোয়াটি রাখা উচিত।
  • নামায শেষে এবং বিশেষ করে তাহাজ্জুদের সময়ে এই দোয়াটি পড়লে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়।
  • সন্তানদেরও এই দোয়াটি শিখানো দরকার, যাতে তাদের জীবন সঠিক পথে পরিচালিত হয়।
  • সমাজে যদি এই চারটি গুণ ছড়িয়ে পড়ে, তবে দুর্নীতি, অশ্লীলতা, লোভ ও গরিবি অনেকটাই কমে যাবে।

 

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
এই দোয়ায় আমরা শিখি যে মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন হলো হিদায়াত, তাকওয়া, পবিত্রতা এবং অন্তরের তৃপ্তি। এগুলো অর্জিত হলে দুনিয়ার সুখ ও আখিরাতের মুক্তি দুটোই পাওয়া যায়।

আসুন, আমরা সকলে আন্তরিকভাবে এই দোয়াটি মুখস্থ করি এবং আল্লাহর কাছে সর্বদা এ চারটি নিয়ামত প্রার্থনা করি—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى

আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই দোয়ার বরকতে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করুন। আমিন।