বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব এখন সুপ্রিম কোর্টের হাতে: হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
- Update Time : ০২:০৯:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / ১৯২ Time View

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্থাপন করেছে হাইকোর্ট। আদালত ঘোষণা করেছে, এখন থেকে সারাদেশের নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি এবং শৃঙ্খলাজনিত সকল বিষয় সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে থাকা বিধান এবং বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের যে ধারা চলে আসছিল, তা বাতিল করে দিয়ে আদালত স্পষ্ট করেছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পথ।
মঙ্গলবার
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ
বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুলের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই সিদ্ধান্ত এসেছে। এ বিষয়ে গত ১৩ আগস্ট চূড়ান্ত শুনানি শেষে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এবং ইন্টারভেনর হিসেবে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম।
এর আগে গত ২০ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নির্দেশে মামলাটি শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চ গঠন করা হয়। এর আগে এটি বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের বেঞ্চে অপেক্ষমাণ ছিল। কিন্তু তিনি আপিল বিভাগে নিয়োগ পাওয়ায় নতুন বেঞ্চ গঠন করা হয়।
মামলার প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট ১০ জন আইনজীবীর পক্ষে রিট আবেদন করেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি মূল সংবিধানের ১৯৭২ সালের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল চেয়ে আবেদন করেন। হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চায় কেন বর্তমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।
বর্তমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “অধস্তন আদালতে কর্মরত বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাজনিত ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকবে।” কিন্তু ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, “বিচার বিভাগের কর্মকর্তা ও বিচারিক দায়িত্বে নিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।”
এ পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের হাতে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা সবসময়ই মনে করেছেন, এটি বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী প্রভাব বিস্তারের একটি বড় কারণ।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথে বড় পদক্ষেপ
হাইকোর্টের এই রায় কার্যকর হলে নিম্ন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আর নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকবে না। এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও জোরদার হবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আদালত যে আলাদা সচিবালয় গঠনের নির্দেশ দিয়েছে, তা বিচার বিভাগকে প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী করবে এবং সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
এ রায়কে অনেকে “বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী প্রভাবের সমালোচনা হয়ে আসছিল, বিশেষ করে পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে। এ রায় কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিচারকদের ওপর রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তাৎপর্য ও প্রতিক্রিয়া
আইনজীবী মহলে রায়টি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সিনিয়র আইনজীবীরা বলছেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বর্তমান ব্যাখ্যা বাতিল হওয়া এবং মূল সংবিধানের ধারা পুনর্বহাল বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী করবে। দেশের সাধারণ মানুষও এর সুফল ভোগ করবে, কারণ একটি স্বাধীন বিচার বিভাগই ন্যায়বিচারের প্রধান শর্ত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রায়টি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আলাদা সচিবালয় গঠন হলে বিচারকদের প্রশাসনিক কাজে আর নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভর করতে হবে না। এর ফলে বিচার প্রক্রিয়া হবে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের আস্থাশীল।











