সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় একদিনেই প্রাণ হারালেন আরও ৬১ ফিলিস্তিনি, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:০০:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১৫৯ Time View

2e9f723c9effe98d936a94ebcc4cb23f 6826a3d1602d9

2e9f723c9effe98d936a94ebcc4cb23f 6826a3d1602d9

গাজা উপত্যকার অবরুদ্ধ ও বিধ্বস্ত অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনাদের অব্যাহত বিমান হামলায় একদিনেই আরও ৬১ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৯ জন ছিলেন সাধারণ মানুষ, যারা মানবিক সহায়তা বা খাবারের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। এছাড়া অপুষ্টি ও অনাহারের কারণে একই দিনে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজন শিশু রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) রাতের দিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু করে পুরো গাজাজুড়ে তীব্র বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি সেনারা। হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল গাজার রাজধানী নগরীর পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল। চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন সাধারণ মানুষ, যারা ত্রাণ সংগ্রহে গিয়েছিলেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এলাকাগুলো থেকে এখনো মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে।

গাজার পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইসরায়েলি সেনারা গাজা নগরীতে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। নগরীটি উপত্যকার সবচেয়ে বড় জনবহুল কেন্দ্র, যেখানে বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি। আন্তর্জাতিক মহল আশঙ্কা করছে, এই অভিযান শুরু হলে প্রাণহানির সংখ্যা অপ্রতিরোধ্যভাবে বাড়বে এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ অভিযানের বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বৃহস্পতিবারের এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গাজা নগরীতে সামরিক অভিযান যুদ্ধের এক নতুন ও ভয়াবহ ধাপ শুরু করতে পারে। লাখ লাখ মানুষ, যারা ইতোমধ্যেই গৃহহীন, ক্লান্ত ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, তারা আবারও আশ্রয় হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি মানবিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থি এবং এর ভয়াবহ পরিণতি অনিবার্য।’

গাজা নগরীর স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণের কারণে হাজার হাজার মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে পালানোর চেষ্টা করছে। ইসরায়েলি বাহিনী বৃহস্পতিবার শুজাইয়া, জায়তুন ও সাবরা এলাকায় তীব্র হামলা চালায়। গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, শুধু জায়তুনের দক্ষিণাঞ্চলেই ১,৫০০টিরও বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, এবং সেখানে প্রায় কোনো ভবন অক্ষত নেই।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গাজা নগরীকে হামাসের ‘শেষ শক্ত ঘাঁটি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের দাবি, পুরো উপত্যকাজুড়ে হামাস যোদ্ধাদের অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে অভিযান চালানো হচ্ছে। সেনারা জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত তিনজন যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে, যদিও তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রমাণ তারা প্রকাশ করেনি।

ফিলিস্তিনি বার্তাসংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে খানের ইউনিসে বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবু শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এক নারী ও তার শিশুও রয়েছে। ক্রমবর্ধমান হামলার কারণে গাজাজুড়ে শিশু ও নারীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এদিকে জাতিসংঘের সাতজন স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এক যৌথ বিবৃতিতে গুম হয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা অভিযোগ করেন, খাবারের সন্ধানে ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে যাওয়া কয়েকজনকে জোরপূর্বক নিখোঁজ করা হয়েছে, যার মধ্যে একজন শিশু রয়েছে। তারা বলেন, ‘ক্ষুধার্ত মানুষকে গুম করা বিস্ময়কর ও নিন্দনীয়। খাবারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে নিখোঁজ করার প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা উচিত।’

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ক্ষুধা ও অপুষ্টিজনিত কারণে আরও চারজন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে দুজন শিশু। চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু অনাহার ও অপুষ্টির কারণে মোট ৩১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ১২১ জন শিশু। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, দীর্ঘদিন অবরোধ ও অব্যাহত হামলার কারণে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজযুম দেইর আল-বালাহ থেকে জানান, ‘গাজায় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে খাবারের জন্য মানুষজন প্রাণের ঝুঁকি নিচ্ছে। অনেক পরিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরছে। শিশুদের মুখে অশ্রু আর ক্লান্তি; বয়স্কদের চোখে আতঙ্ক।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান সংঘাত শুধু গাজাই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যও অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে। ইসরায়েলি হামলার ভয়াবহতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অক্ষমতা গাজার মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তুলছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় একদিনেই প্রাণ হারালেন আরও ৬১ ফিলিস্তিনি, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

Update Time : ১১:০০:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫

2e9f723c9effe98d936a94ebcc4cb23f 6826a3d1602d9

গাজা উপত্যকার অবরুদ্ধ ও বিধ্বস্ত অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনাদের অব্যাহত বিমান হামলায় একদিনেই আরও ৬১ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৯ জন ছিলেন সাধারণ মানুষ, যারা মানবিক সহায়তা বা খাবারের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। এছাড়া অপুষ্টি ও অনাহারের কারণে একই দিনে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজন শিশু রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) রাতের দিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু করে পুরো গাজাজুড়ে তীব্র বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি সেনারা। হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল গাজার রাজধানী নগরীর পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল। চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন সাধারণ মানুষ, যারা ত্রাণ সংগ্রহে গিয়েছিলেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এলাকাগুলো থেকে এখনো মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে।

গাজার পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইসরায়েলি সেনারা গাজা নগরীতে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। নগরীটি উপত্যকার সবচেয়ে বড় জনবহুল কেন্দ্র, যেখানে বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি। আন্তর্জাতিক মহল আশঙ্কা করছে, এই অভিযান শুরু হলে প্রাণহানির সংখ্যা অপ্রতিরোধ্যভাবে বাড়বে এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ অভিযানের বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বৃহস্পতিবারের এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গাজা নগরীতে সামরিক অভিযান যুদ্ধের এক নতুন ও ভয়াবহ ধাপ শুরু করতে পারে। লাখ লাখ মানুষ, যারা ইতোমধ্যেই গৃহহীন, ক্লান্ত ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, তারা আবারও আশ্রয় হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি মানবিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থি এবং এর ভয়াবহ পরিণতি অনিবার্য।’

গাজা নগরীর স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণের কারণে হাজার হাজার মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে পালানোর চেষ্টা করছে। ইসরায়েলি বাহিনী বৃহস্পতিবার শুজাইয়া, জায়তুন ও সাবরা এলাকায় তীব্র হামলা চালায়। গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, শুধু জায়তুনের দক্ষিণাঞ্চলেই ১,৫০০টিরও বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, এবং সেখানে প্রায় কোনো ভবন অক্ষত নেই।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গাজা নগরীকে হামাসের ‘শেষ শক্ত ঘাঁটি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের দাবি, পুরো উপত্যকাজুড়ে হামাস যোদ্ধাদের অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে অভিযান চালানো হচ্ছে। সেনারা জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত তিনজন যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে, যদিও তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রমাণ তারা প্রকাশ করেনি।

ফিলিস্তিনি বার্তাসংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে খানের ইউনিসে বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবু শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এক নারী ও তার শিশুও রয়েছে। ক্রমবর্ধমান হামলার কারণে গাজাজুড়ে শিশু ও নারীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এদিকে জাতিসংঘের সাতজন স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এক যৌথ বিবৃতিতে গুম হয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা অভিযোগ করেন, খাবারের সন্ধানে ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে যাওয়া কয়েকজনকে জোরপূর্বক নিখোঁজ করা হয়েছে, যার মধ্যে একজন শিশু রয়েছে। তারা বলেন, ‘ক্ষুধার্ত মানুষকে গুম করা বিস্ময়কর ও নিন্দনীয়। খাবারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে নিখোঁজ করার প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা উচিত।’

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ক্ষুধা ও অপুষ্টিজনিত কারণে আরও চারজন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে দুজন শিশু। চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু অনাহার ও অপুষ্টির কারণে মোট ৩১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ১২১ জন শিশু। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, দীর্ঘদিন অবরোধ ও অব্যাহত হামলার কারণে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজযুম দেইর আল-বালাহ থেকে জানান, ‘গাজায় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে খাবারের জন্য মানুষজন প্রাণের ঝুঁকি নিচ্ছে। অনেক পরিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরছে। শিশুদের মুখে অশ্রু আর ক্লান্তি; বয়স্কদের চোখে আতঙ্ক।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান সংঘাত শুধু গাজাই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যও অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে। ইসরায়েলি হামলার ভয়াবহতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অক্ষমতা গাজার মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তুলছে।