ফারইস্ট লাইফে ২৮০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, উদ্ধার হয়নি একটি টাকাও মামলার আসামি ও আত্মীয়-স্বজনরাই পরিচালনা পর্ষদে
- Update Time : ১০:০৬:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫
- / ৪২২ Time View

দেশের বীমা খাতে নজিরবিহীন অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা আত্মসাৎ হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে—উদ্ধার হয়নি একটি টাকাও। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ ঘটনায় একের পর এক মামলা করলেও অর্থ উদ্ধার ও দায়ীদের বিচারের কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। বরং অভিযুক্তদের অনেকেই এখনও কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে বহাল থেকে প্রভাব বিস্তার করছেন, যা এই অর্থ পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মামলায় আসামি প্রভাবশালী পরিচালকরা
দুদকের সর্বশেষ মামলায় বীমা কোম্পানিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামসহ ১৪ জন পরিচালককে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন আমানত শাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান হেলাল মিয়া, মোশারফ গ্রুপের পরিচালক নাজনীন হোসেন, মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মো. মনোয়ার হোসেন, প্রাইম ব্যাংক ও প্রাইম ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তা এম এ খালেক, টারটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ড. ইফফাৎ জাহানসহ আরও অনেকে। মামলার তালিকায় থাকা এদের অধিকাংশই দেশের নামকরা শিল্পগোষ্ঠী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী উদ্যোক্তা।
অভিযোগ রয়েছে, এদের অনেকে নিজেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বা ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে কোম্পানির তহবিল থেকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে আত্মসাৎ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমানত শাহ সিকিউরিটিজ লিমিটেডে বিনিয়োগ করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ লোকসান গুনেছে ৬০ কোটি টাকারও বেশি। অথচ আইন অনুযায়ী পরিচালকদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য বোর্ডের পূর্বানুমোদন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা ছিল।
জমি ক্রয়ে দুর্নীতির জাল
কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের অন্যতম বড় ক্ষেত্র ছিল জমি ক্রয়। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং-এর তদন্তে উঠে আসে, কেবল মিরপুরের গোড়ান চটবাড়ি এলাকায় জমি কেনার নামে ১৮০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ছাড়া কাকরাইল ও তোপখানা রোডে জমি ক্রয়ের নামে আরও শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে ২০১৬ সালের বোর্ড সভায় নেওয়া জমি ক্রয়ের সিদ্ধান্তে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন বর্তমান পরিচালক নাজনীন হোসেন ও আয়েশা হুসনে জাহান। এসব জমি ক্রয়ের সিদ্ধান্তের সময় তারা বোর্ডে সক্রিয় থাকলেও এখনও পরিচালনা পর্ষদে বহাল আছেন, যা তদন্ত ও অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন তুলছে।
প্রভাবশালী পরিবারের দাপট
তদন্তে আরও দেখা গেছে, অভিযুক্ত পরিচালকরা শুধু নিজেরাই নয়, পরিবারের সদস্যদেরও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছেন। যেমন, দুদকের মামলায় অভিযুক্ত ডা. মনোয়ার হোসেনের ভাই ড. মোকাদ্দেস হোসেন বর্তমানে কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান। আরেক ভাই মোজাম্মেল হোসেনও মামলার আসামি। একইভাবে, হেলাল মিয়ার ভাই মোবারক হোসেন বর্তমানে কোম্পানির নিরপেক্ষ পরিচালক হলেও তিনি আমানত শাহ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
এই প্রভাবশালী পরিবারগুলোর নিয়ন্ত্রণের কারণে পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিনিয়োগকারী, গ্রাহক ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা পুনরুদ্ধারের পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বীমা বাজারে আস্থাহীনতা
ফারইস্ট ইসলামী লাইফে চলমান দুর্নীতির প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গ্রাহকদের দাবি পূরণে ব্যর্থতার কারণে বীমা বাজারে ব্যাপক আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। গ্রাহকরা বীমার প্রিমিয়াম জমা দিয়েও মেয়াদ শেষে টাকা পাচ্ছেন না। এর ফলে বিভিন্ন শাখায় গ্রাহক ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন, মাঠকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে, এমনকি অফিস ভাঙচুরও হচ্ছে।
শেয়ারহোল্ডার পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একাধিকবার কোম্পানিটির বোর্ডে হস্তক্ষেপ করেছে। একসময় বেক্সিমকো গ্রুপ শেয়ার কিনে বোর্ড পুনর্গঠন করলেও দুর্নীতি দমন ও অর্থ উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন বোর্ড গঠন হলেও পুরনো প্রভাবশালী মহলের দাপট কমেনি।
অভিযুক্তদের পাল্টা বক্তব্য
দুদকের মামলার অন্যতম আসামি নাজনীন হোসেনের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে তার স্বামী মোশারফ হোসেন পুস্তী বলেন, “এই মামলায় হয়তো ভুলবশত নাজনীন হোসেনের নাম এসেছে। প্রকৃতপক্ষে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে নজরুল ইসলাম পরিবার ও এম এ খালেক পরিবার ছাড়া অন্য কেউ জড়িত নয়। আমরা আইনগতভাবে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করব।”
তবে বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোকাদ্দেস হোসেন বা পরিচালক মোবারক হোসেনের কেউই এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য দেননি।
কঠোর ব্যবস্থা জরুরি
বীমা শিল্পের বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ এবং কোম্পানির আর্থিক সংকট পুরো বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। তারা মনে করছেন, অভিযুক্তদের প্রভাবমুক্ত একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার দৃঢ় পদক্ষেপ ছাড়া এই অর্থ উদ্ধারের কোনো বাস্তবসম্মত সুযোগ নেই।
একজন বীমা বিশ্লেষক বলেন, “এই কেলেঙ্কারি কেবল ফারইস্ট ইসলামী লাইফের জন্য নয়, পুরো বীমা খাতের জন্য হুমকি। বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকরা আস্থা হারালে বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে। এখনই কঠোর নজরদারি ও অর্থ উদ্ধারের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।”
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের এই দুর্নীতির কাহিনী এখন দেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও জবাবদিহিতাহীনতার বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। মামলা ও তদন্তে ধীরগতির কারণে সাধারণ মানুষ আরও হতাশ হচ্ছেন। একদিকে গ্রাহকরা তাদের প্রাপ্য অর্থের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, অন্যদিকে প্রভাবশালীরা বহাল তবিয়তে বোর্ডে বসে আছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শক্তিশালী নীতিমালা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প দেখা যাচ্ছে না।










