ডাকসু নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন, নিরাপত্তা জোরদারে কঠোর পদক্ষেপ
- Update Time : ০২:০৭:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৫৮ Time View

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের দিন সেনাবাহিনী ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে বলে জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) ডাকসু নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোটগ্রহণের দিন সকাল থেকে ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেনা সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশপথগুলোতে অবস্থান করবেন। ভোট শেষে ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত ক্যাম্পাস কর্ডন করে রাখবে সেনারা, যাতে বহিরাগত কেউ প্রবেশ করতে না পারে এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা
চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, নির্বাচনের দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি প্রধান গেটে সেনা সদস্যরা মোতায়েন থাকবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা সরাসরি দায়িত্ব পালন করবেন। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ভোটের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ থাকবে। এছাড়া নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে কোনো বহিরাগত থাকতে পারবে না। নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
প্রচার–প্রচারণার নিয়মাবলি
আজ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রার্থীরা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত প্রচারণা চালাতে পারবেন। তবে ছাত্রীদের হলে রাত ১০টার পর প্রচারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের পোস্টার, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিতরণের বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে এবং কঠোর আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় যদি কোনো প্রার্থী মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় বা পারিবারিক পরিচয় ব্যবহার করে কাউকে অপদস্থ করার চেষ্টা করেন, তাহলে তার প্রার্থিতা বাতিল এবং ছাত্রত্ব রদ করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে নির্বাচন কমিশন।
প্রার্থিতা প্রত্যাহার
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন সোমবার পর্যন্ত মোট ২১ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন ছাত্রদল-সমর্থিত প্রার্থীও রয়েছেন। ঘোষিত প্যানেলে স্থান না পাওয়ায় এবং দলীয় সিদ্ধান্তে তারা সরে দাঁড়িয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন অভিযোগে বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্র নিয়ে ৩৪ জন প্রার্থী আপিল করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে সবার মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই প্রার্থী—জুলিয়াস সিজার তালুকদার ও বায়েজিদ বোস্তামী—এর প্রার্থিতা বাতিল এবং তাদের ভোটাধিকারও স্থগিত করা হয়েছে।
জুলিয়াস সিজার প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগ অস্বীকার করে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
প্রশাসন–আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠক করেছে। উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, রিটার্নিং কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী, প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ, ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী, সিটি এসবির ডিআইজি মীর আশরাফ আলী, রমনা জোনের উপকমিশনার মো. মাসুদ আলম ও শাহবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ খালিদ মুনসুর। বৈঠকে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে ভোট প্রদান নিশ্চিত করতে বিস্তারিত কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
আচরণবিধির বিস্তারিত নির্দেশনা
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী:
- প্রার্থীরা শুধুমাত্র সাদাকালো পোস্টার, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল ব্যবহার করতে পারবেন।
- প্রার্থীর নিজস্ব সাদাকালো ছবি ছাড়া অন্য কোনো প্রতীক বা ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ।
- ক্যাম্পাস ও হল এলাকায় স্থাপনা, দেয়াল, যানবাহন, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা গাছে পোস্টার লাগানো যাবে না।
- দেয়াল বা অন্যান্য স্থাপনায় কালি, চুন বা রাসায়নিক দিয়ে কোনো লিখন বা চিত্র আঁকা নিষিদ্ধ।
- ফটক, তোরণ বা স্থায়ী ঘের তৈরি করা যাবে না, তবে অস্থায়ী প্যান্ডেল ও মঞ্চ করা যাবে।
- কোনো উপাসনালয়, শ্রেণিকক্ষ, পাঠকক্ষ ও পরীক্ষার হলে প্রচার করা যাবে না।
- ভোটারদের কোনো ধরনের উপঢৌকন বা অর্থসাহায্য দেওয়া নিষিদ্ধ।
- প্রচারে আক্রমণাত্মক বা উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া যাবে না।
- সভা-সমাবেশ বা শোভাযাত্রার জন্য অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে অনুমতি নিতে হবে।
- প্রচারে বা ভোটের দিন কোনো খাবার বা পানীয় পরিবেশন নিষিদ্ধ।
- প্রতিটি হলে একটি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি প্রজেকশন মিটিংয়ের অনুমতি থাকবে।
- অনলাইনে প্রচার চালানো যাবে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কেউ ক্যাম্পাসে এসে প্রচারে অংশ নিতে পারবে না।
আচরণবিধি ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিল, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার অথবা আইনি শাস্তির বিধান রয়েছে।
প্রেক্ষাপট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ডাকসু নির্বাচন সবসময়ই আলোচিত একটি বিষয়। অতীতে এই নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক জাতীয় নেতা উঠে এসেছেন। তাই এবারের নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তেমনি শঙ্কাও রয়েছে। সহিংসতা প্রতিরোধে সেনাবাহিনী মোতায়েনের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য আশার বার্তা হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।











