অনুসন্ধানী প্রতিবেদন — বীমা সংকট ও ভুক্তভোগীদের আর্তি: Fareast Islami Life Insurance, নিয়ন্ত্রকের অবহেলা ও অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা
- Update Time : ০৩:২৯:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫
- / ৪৭৮ Time View

বাংলাদেশের বীমা খাত গত ২০২৩–২০২৫ সময়ে সবচেয়ে বড় আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে লাইফ ইন্স্যুরেন্স সেক্টরে লক্ষাধিক গ্রাহক মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসির অর্থ পাচ্ছেন না। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম Fareast Islami Life Insurance, যারা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি দাবির টাকা আটকে রেখেছে।
সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা IDRA বিশেষ অডিট শুরু করলেও প্রকৃত ক্ষতিপূরণ এখনো নগণ্য। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে—প্রশ্ন উঠছে, কেন তারা জনগণের সঞ্চিত অর্থ ফেরাতে কোম্পানির সম্পদ জব্দ ও বিক্রির উদ্যোগ নিল না?
১) পরিস্থিতি ও বাস্তবতা
- ২০২৪ সালে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো মোট Tk 4,374 কোটি টাকার দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছিল।
- এর মধ্যে এককভাবে Fareast Islami Life Insurance-এর অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ Tk 2,976 কোটি (২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত), কিন্তু কোম্পানি মাত্র ~Tk 58.35 কোটি প্রদান করেছে, অর্থাৎ দাবির ৯৮% এখনো ঝুলে আছে।
- সারাদেশে আনুমানিক ১০ লাখের বেশি পলিসি-হোল্ডার আজও তাদের প্রাপ্য টাকার জন্য অপেক্ষায়।
২) অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা — প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বীমা সংকট মোকাবেলায় তারা শক্তিশালী পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে—
- ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, সরকার কেবল অডিট ও তদন্তে সীমাবদ্ধ থেকেছে, কিন্তু গ্রাহকের টাকা ফেরানোর কোনো জরুরি রিলিফ মেকানিজম তৈরি করেনি।
- সরকারের হাতে আইনগত ক্ষমতা থাকলেও তারা এখনো কোম্পানির জমি, বিলাসবহুল অফিস ভবন বা অন্যান্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে বিক্রির পদক্ষেপ নেয়নি।
- ফলস্বরূপ, কোম্পানির প্রভাবশালী পরিচালকেরা বেঁচে গেছেন, কিন্তু সাধারণ গ্রাহকরা সর্বস্ব হারিয়েছেন।
৩) কেন Fareast তাদের সম্পদ বিক্রি করছে না?
Fareast Islami Life Insurance-এর হাতে ঢাকা, গুলশান, কাকরাইলসহ বিভিন্ন স্থানে জমি ও স্থাবর সম্পদ রয়েছে। গণমাধ্যমে খবর এসেছে, আংশিক সম্পদ বিক্রির চেষ্টা হলেও প্রকৃত অর্থে তা গ্রাহকদের প্রাপ্য ফেরাতে কাজে লাগেনি।
- যদি সম্পদ বিক্রি সম্ভব হয়, তবে কেন এতদিন তা বাস্তবায়ন হলো না?
- কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ও প্রাক্তন পরিচালকরা কি সম্পদের বাজারমূল্য কম দেখিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে লেনদেন করতে চাইছেন?
- IDRA এবং অন্তর্বর্তী সরকার কেন আদালতের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক বিক্রির নির্দেশ দেয় না?
এই ব্যর্থতা ইঙ্গিত করে যে, সম্পদের সঠিক ব্যবহার না করে কেবল সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে, যা ভুক্তভোগীদের জন্য আর্থিক নির্যাতনের শামিল।
৪) ভুক্তভোগীদের আর্তি ও বাস্তব জীবনের সংকট
বেশিরভাগ পলিসি-হোল্ডার মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। অনেকে অবসরের পর চিকিৎসার খরচ চালানোর জন্য পলিসির টাকা আশা করেছিলেন, কেউ সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও তারা প্রাপ্য পাচ্ছেন না।
- অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়েছে।
- কেউ কেউ জমি বা গহনা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।
- এমনকি কিছু পরিবারে অভিভাবকের মৃত্যু হলেও বীমার টাকা মেলেনি, ফলে সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
৫) নিয়ন্ত্রক ও সরকারের অকার্যকারিতা
- IDRA-র হাতে আইনগত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া এখন প্রধান সমালোচনার বিষয়।
- অন্তর্বর্তী সরকার কেবল তদন্তের ঘোষণা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে—তারা ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক রিলিফ ফান্ড বা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরাসরি অর্থ ফেরানোর ব্যবস্থা করেনি।
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এই ব্যর্থতা বীমা খাতে আস্থা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
৬) অনুসন্ধান থেকে উদ্ভূত প্রধান ব্যর্থতা
১. অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা — নীতিগত ও প্রশাসনিক স্তরে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।
২. কোম্পানির সম্পদ বিক্রি না করে কেবল অজুহাত তৈরি।
৩. ভুক্তভোগীদের আর্থিক দুর্দশার প্রতি সরকারি উদাসীনতা।
৪. IDRA-র ধীরগতি ও দুর্বল জবাবদিহিতা।
৭) নীতিনির্ভর সুপারিশ
১. অবিলম্বে সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও বিক্রয়: সরকারের উচিত আদালতের মাধ্যমে Fareast ও অন্যান্য কোম্পানির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগীদের পাওনা ফেরত দেওয়া।
২. ইন্টারিম পলিসি–হোল্ডার রিলিফ ফান্ড: অন্তর্বর্তী সরকার একটি জরুরি ফান্ড গঠন করে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে তাৎক্ষণিক অর্থ প্রদান নিশ্চিত করতে পারে।
৩. স্বতন্ত্র ফরেনসিক অডিট: সব আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. আইন সংশোধন ও কঠোর শাস্তি: বীমা আইনে দণ্ড ও জরিমানার ধারা কঠোরভাবে কার্যকর করা।
৫. গ্রাহক তথ্যভাণ্ডার ও হটলাইন: প্রতিটি দাবির অবস্থা প্রকাশ করে একটি উন্মুক্ত ডাটাবেস চালু করা।
বাংলাদেশের লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাত এখন এক গভীর আস্থাহীনতার মুখে। ভুক্তভোগীদের বছরের পর বছর ধরে টাকা আটকে রাখা কেবল একটি কোম্পানির অনিয়ম নয়, বরং সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও নিয়ন্ত্রকের দুর্বলতার প্রতিফলন। অন্তর্বর্তী সরকার যদি এখনই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে পাওনা পরিশোধের কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে সাধারণ মানুষ আর কখনো বীমার উপর আস্থা রাখবে না।










