শারীরিক সম্পর্কে নারীদের অনীহার পেছনে গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা: সমাধান কীভাবে?
- Update Time : ০৫:৫৭:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ অগাস্ট ২০২৫
- / ৩০২ Time View

বৈবাহিক জীবনে মানসিক ও শারীরিক সম্পর্ক সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্কে অনীহা তৈরি হয়, যা সম্পর্ককে তিক্ত ও অশান্ত করে তোলে। সাধারণত এ সমস্যার দায় পুরুষদের কাঁধে চাপানো হলেও বাস্তবে অনেক নারীও নানা কারণে শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং চিকিৎসাযোগ্য একটি মেডিকেল কন্ডিশন। তাই এটিকে লজ্জা বা ট্যাবু ভেবে গোপন না রেখে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
রোগীর অভিজ্ঞতা: নীরব কষ্ট
ঢাকার বাসিন্দা রুবিনা (ছদ্মনাম), বয়স ৩৪। বিবাহিত জীবনের শুরুতে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সন্তান জন্মের পর থেকে ধীরে ধীরে তিনি শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। প্রথমে বিষয়টি তিনি লজ্জায় কাউকে বলেননি। স্বামী ভেবেছিলেন এটি হয়তো সাময়িক। কিন্তু সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব বাড়তে থাকে। পরে চিকিৎসকের কাছে গেলে জানা যায়, রুবিনা ভুগছেন হাইপোএকটিভ সেক্স্যুয়াল ডিজায়ার ডিজঅর্ডার (HSDD)-এ। সঠিক কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিনি সুস্থতার পথে এগোচ্ছেন।
এমন অভিজ্ঞতা শুধু রুবিনার নয়। গবেষণা বলছে, সারা বিশ্বের অসংখ্য নারী এ সমস্যায় ভুগছেন, তবে অধিকাংশই সামাজিক ট্যাবু ও লজ্জার কারণে বিষয়টি গোপন রাখেন।
HSDD কী?
চর্ম ও যৌন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাসনিম তামান্না হক, চিফ কনসালট্যান্ট, স্কিনেজ ডার্মাকেয়ার, জানালেন—
“হাইপোএকটিভ সেক্স্যুয়াল ডিজায়ার ডিজঅর্ডার (HSDD) হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে নারী দীর্ঘমেয়াদে বা বারবার শারীরিক সম্পর্কে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। সাধারণত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে এ ধরনের সমস্যা থাকলে আমরা এটিকে HSDD হিসেবে ধরি। এতে শুধু যৌন সম্পর্কে অনীহা নয়, বরং মানসিক দূরত্ব ও বৈবাহিক অশান্তি দেখা দেয়।”
HSDD-তে আক্রান্ত নারীরা সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহও হারিয়ে ফেলতে পারেন। এর প্রভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্ক ভাঙনের ঝুঁকিও বাড়ে।
কতটা সাধারণ এই সমস্যা?
আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী—
- প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে অন্তত ১ জন HSDD-তে আক্রান্ত।
- নারীর জীবনের নির্দিষ্ট পর্যায়ে, বিশেষ করে পেরিমেনোপজ ও মেনোপজে, এ সমস্যার হার ২৬% থেকে ৫২% পর্যন্ত হতে পারে।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৩% নারী অন্তত একবার যৌন স্বাস্থ্য–সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগেন, যার মধ্যে HSDD অন্যতম।
অর্থাৎ, এটি মোটেও বিরল সমস্যা নয়, বরং অনেক বেশি সাধারণ; তবে আলোচনার বাইরে থাকায় অনেকেই জানেন না যে এর চিকিৎসা সম্ভব।
সম্ভাব্য কারণসমূহ
নারীদের শারীরিক সম্পর্কে অনীহার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যেগুলো শারীরিক ও মানসিক—উভয় দিক থেকেই প্রভাব ফেলে।
শারীরিক কারণ
- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড সমস্যা বা হার্ট ডিজিজ
- হরমোনজনিত সমস্যা, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন ও টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি
- গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মের পর শারীরিক পরিবর্তন
- মেনোপজ বা পেরিমেনোপজ
মানসিক ও সামাজিক কারণ
- দীর্ঘদিনের স্ট্রেস, ডিপ্রেশন বা এংজাইটি
- সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা মানসিক অশান্তি
- পূর্বের ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা (যেমন যৌন হয়রানি)
- আত্মবিশ্বাসের অভাব বা শারীরিক চেহারা নিয়ে হীনমন্যতা
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট
- ব্লাড প্রেশারের বিটা ব্লকার
- ঘুমের ওষুধ
চিকিৎসা: করণীয় কী?
চিকিৎসকদের মতে, HSDD-এর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কারণ নির্ণয়। এজন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
- কাউন্সেলিং ও থেরাপি
- অনেক ক্ষেত্রে দম্পতির যৌথ কাউন্সেলিং প্রয়োজন হয়। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যোগাযোগ উন্নত হয় এবং ভুল বোঝাবুঝি কমে।
- মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সাইকোথেরাপি (যেমন CBT) কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
- শারীরিক পরীক্ষা ও ইনভেস্টিগেশন
- হরমোনের ভারসাম্য পরীক্ষা
- ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা অন্যান্য ক্রনিক রোগের পরীক্ষা
- ওষুধ
- কিছু ওষুধ বাজারে পাওয়া যায় যা নারীদের যৌন আকাঙ্ক্ষা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। তবে এগুলো চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ছাড়া ব্যবহার করা বিপজ্জনক।
- অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ সেবন হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- লাইফস্টাইল পরিবর্তন
- নিয়মিত ব্যায়াম
- স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ
- স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও পর্যাপ্ত ঘুম
বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী বলছে?
- ২০১৯ সালে Journal of Women’s Health-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, মেনোপজোত্তর নারীদের মধ্যে HSDD-এর হার সবচেয়ে বেশি।
- National Institutes of Health (NIH)-এর গবেষণা অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন ডিপ্রেশন HSDD-র ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়ায়।
- British Medical Journal-এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, জীবনধারা পরিবর্তন (exercise, mindfulness, stress reduction) এবং কাউন্সেলিং HSDD চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নারীদের শারীরিক সম্পর্কে অনীহা কোনো ‘দোষ’ বা ‘অলসতা’ নয়, বরং এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা। লজ্জা, সংকোচ কিংবা সামাজিক ট্যাবুর কারণে নীরবে ভোগা উচিত নয়। বরং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে সঠিক কারণ নির্ণয় ও চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
সঠিক চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে HSDD কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তাতে শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কই নয়, নারীর ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সুস্থতাও ফিরে আসে।










