বিবাহিত পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্কের দায় শুধু নারীর ঘাড়ে চাপানো হয় কেন?
- Update Time : ০৫:৫৮:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৬০ Time View

বলিউডে স্পষ্টভাষী অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত কঙ্গনা রানাউত আবারও আলোচনায় এসেছেন তাঁর সাহসী মন্তব্যের কারণে। এবার তিনি সরব হয়েছেন একটি বহুল আলোচিত সামাজিক প্রবণতা নিয়ে—বিবাহিত পুরুষ কোনো সম্পর্কে জড়ালেও সমাজ দোষারোপ করে কেবল নারীকেই। কঙ্গনার মতে, এই মানসিকতা শুধু পুরনো কুসংস্কারের ধারাবাহিকতা নয়, বরং নারীকে সবসময় নিচে নামিয়ে রাখার এক ধরনের সামাজিক কৌশল।
সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কঙ্গনার প্রশ্ন
সম্প্রতি ভারতের একটি জনপ্রিয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘হাউটারফ্লাই’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কঙ্গনা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যদি একজন বিবাহিত পুরুষ কোনো নারীর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, তবে কেন কেবল সেই নারীকে দায়ী করা হয়? পুরুষের ভূমিকাকে কেন আড়াল করা হয়?” তাঁর মতে, সমাজে নারীর প্রতি দোষারোপের সংস্কৃতি এতটাই গভীর যে ধর্ষণ কিংবা যৌন হয়রানির মতো ঘটনায়ও নারীর পোশাক, চলাফেরা কিংবা সময়কে দায়ী করা হয়। একইভাবে বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে কোনো নারী সম্পর্কে জড়ালে কেবল নারীকে কলঙ্কিত করা হয়।
কঙ্গনার বক্তব্য শুধু বলিউড নয়, গোটা দক্ষিণ এশীয় সমাজের বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা যেমন প্রবল, তেমনি পুরুষের ভুল বা অপরাধ অনেক সময় আড়াল করা হয়। এর ফলে নারী দ্বিগুণভাবে ভুক্তভোগী হয়—একদিকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে, অন্যদিকে সামাজিক বিচার ও নিন্দার বোঝা বয়ে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বেদনাদায়ক অধ্যায়
কঙ্গনার জীবনের অভিজ্ঞতা এই আলোচনাকে আরও গভীর করেছে। তরুণ বয়সে তিনি অভিনেতা আদিত্য পাঞ্চোলির সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। সে সময় আদিত্য ছিলেন বিবাহিত ও সন্তানের পিতা। কঙ্গনা পরে অভিযোগ করেন, ওই সম্পর্কের মধ্যে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৯ সালে তিনি আদিত্যর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হেনস্তার মামলা দায়ের করেন। কিন্তু সমাজ ও মিডিয়ার বড় একটি অংশ উল্টো কঙ্গনাকেই দায়ী করতে থাকে।
কঙ্গনা জানান, তিনি আদিত্যের স্ত্রী জারিনা ওয়াহাবের কাছ থেকেও সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি এমনভাবে দাঁড়ায় যে, তাঁকেই সমাজ একপ্রকার “ফাঁদে ফেলে” অভিযুক্ত করে তোলে। তাঁর ভাষায়, “আমার ওপর শারীরিক অত্যাচার করা হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম মানুষ আমাকে সাহায্য করবে। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে আমাকে একাই দায় বহন করতে হয়েছে।” এই অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয় এবং আজও তিনি মনে করেন, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ছাড়া নারীর মুক্তি অসম্ভব।

বলিউডে নারীর প্রতি দ্বিমুখী আচরণ
বলিউডে পুরুষ অভিনেতাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব কমই প্রশ্ন তোলা হয়। তারা একাধিক সম্পর্কে জড়ালেও সমাজ সহজভাবে নেয় বা কখনো কখনো তাদের ‘প্লেবয়’ ইমেজ হিসেবে গ্ল্যামারাইজ করা হয়। কিন্তু নারীরা যদি একই পরিস্থিতিতে পড়েন, তাদের ‘ক্যারেক্টারলেস’ বা ‘অপরাধী’ বানিয়ে দেওয়া হয়। কঙ্গনার মতে, এই বৈষম্যই প্রমাণ করে শিল্প ও সংস্কৃতির ভেতরেও কতটা গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা প্রোথিত হয়ে আছে।
একজন সফল অভিনেত্রী থেকে লড়াকু কণ্ঠস্বর
২০০৬ সালে ‘গ্যাংস্টার’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে যাত্রা শুরু করেন কঙ্গনা রানাউত। এরপর ‘ওহ লামহে’, ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’, ‘কুইন’, ‘তনু ওয়েডস মনু রিটার্নস’, ‘মণিকর্ণিকা’সহ একাধিক ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অন্যতম সেরা অভিনেত্রী হিসেবে। সম্প্রতি তিনি নিজেই লেখা, পরিচালিত ও প্রযোজিত চলচ্চিত্র ‘ইমার্জেন্সি’-তে অভিনয় করেছেন। তাঁর এই পথচলায় যেমন সাফল্য এসেছে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রামও তাঁকে সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে গড়ে তুলেছে।
কঙ্গনার বার্তা সমাজের প্রতি
কঙ্গনার সাম্প্রতিক বক্তব্য এক বড় প্রশ্ন তুলেছে—একটি সম্পর্কে দুই পক্ষ থাকলেও কেন শুধু নারীর ওপরই দায় চাপানো হয়? নারীর স্বাধীনতা ও সম্মানকে আঘাত করার এই প্রবণতা কবে থামবে?
এ প্রসঙ্গে নারীবাদী গবেষক ও সমাজবিদরাও একমত যে, দক্ষিণ এশীয় সমাজে নারীর বিরুদ্ধে দোষারোপ একটি কাঠামোগত বৈষম্য। এর মূল কারণ হলো পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারা, যা নারীকে সবসময়ই নিচে রাখার চেষ্টা করে। কঙ্গনার মতো খ্যাতিমান একজন তারকা যখন এ বিষয়ে সরব হন, তখন বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে এবং পরিবর্তনের দাবি জোরদার হয়।
কঙ্গনার কণ্ঠে তাই শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং এক প্রজন্মের নারীর প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে—নারীদের দোষারোপ করার মানসিকতা যদি বদলানো না যায়, তবে সমানাধিকার কখনোই বাস্তবে রূপ নেবে না।










