সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আসিফ নজরুলের বক্তব্য : ডাক্তারদের পেশাদারিত্বের ওপর আঘাত নাকি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব চিত্র?

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৬:১২:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৫
  • / ২৬৭ Time View

9999 20250817142844

9999 20250817142844

সম্প্রতি বিশিষ্ট আইনজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে চিকিৎসক সমাজকে ‘ওষুধ কোম্পানির দালাল’ আখ্যা দেন। তাঁর এই মন্তব্যে চিকিৎসক মহলে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, এটি শুধু অযৌক্তিক নয়, বরং চিকিৎসকদের আত্মমর্যাদা ও পেশাদারিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।

চিকিৎসকদের প্রতিক্রিয়া ক্ষোভ

ডা. রফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন, ডাক্তারি পেশা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে এখনো অসংখ্য অভিভাবক তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। সে দেশে একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সমাজের মতামত-নির্ধারক ব্যক্তিত্বের মুখে এ ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য আসলে তা জনমনে চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। তিনি মনে করিয়ে দেন, করোনাভাইরাস মহামারির সময় চিকিৎসক ও নার্সরা জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন। মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, এমনকি সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনেও চিকিৎসকরা শহীদ হয়েছেন, আহতদের সেবা দিয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। সেই ইতিহাস অস্বীকার করে গোটা চিকিৎসক সমাজকে ‘দালাল’ হিসেবে চিত্রিত করা ন্যূনতম সৌজন্যের মধ্যে পড়ে না।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবতা

তবে সমালোচনার মধ্যেও এক প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে—আসিফ নজরুল কি আসলেই মিথ্যা বলেছেন, নাকি বাস্তবতার একটি তিক্ত দিক সামনে এনেছেন? বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে ওষুধ কোম্পানির প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ওষুধ কোম্পানির পক্ষ থেকে অনেক সময় চিকিৎসকদের আর্থিক বা উপঢৌকন প্রণোদনা দিয়ে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড প্রেসক্রাইব করানো হয়। একইভাবে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে চাপ দেওয়া এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্যাকেজ প্রস্তাব করার অভিযোগও বহুবার এসেছে সংবাদমাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের রিপোর্টগুলোতেও এ ধরনের অনিয়মের উল্লেখ রয়েছে।

তবে এটি গোটা চিকিৎসক সমাজের চিত্র নয়। বাস্তবে দেশের বেশিরভাগ চিকিৎসক সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অপ্রতুল অবকাঠামো ও কম বেতনের মধ্যেও নিবেদিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট, অব্যবস্থাপনা, সীমিত সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও তাঁদের কাজ অবিস্মরণীয়। একদিকে কিছু অনিয়ম আছে, অন্যদিকে অসংখ্য ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গও রয়েছে। ফলে ঢালাওভাবে পুরো চিকিৎসক সমাজকে দোষারোপ করলে তা অন্যায়ই হয়।

দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন

ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক সমাজে অনিয়ম থাকলে তা সমাধান করতে হবে নীতি-প্রণয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে। কোনোভাবেই ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে সমাধান আসবে না। বরং এতে সাধারণ মানুষ চিকিৎসকদের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়বে, যা স্বাস্থ্য খাতের জন্য ক্ষতিকর। তাঁর প্রশ্ন, একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আসিফ নজরুল কি সচেতনভাবে বিতর্ক তৈরি করে সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করছেন? নাকি তিনি চিকিৎসকদের বদনাম করে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণকে প্রচারণা দিচ্ছেন?

আসিফ নজরুলের বক্তব্য নিঃসন্দেহে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, তাঁর বক্তব্য অতিরঞ্জিত ও অবমাননাকর। আবার অনেকে মনে করেন, তিনি স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব দুর্নীতিগ্রস্ত চিত্রটিকেই সামনে এনেছেন, যদিও তা বলার ধরন ছিল অনুপযুক্ত। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত একদিকে নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকদের ত্যাগে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে একটি অংশের অনিয়ম ও ব্যবসায়ীকরণে ক্ষতিগ্রস্ত। এই দ্বিমুখী বাস্তবতার মাঝেই জন্ম নেয় বিতর্ক।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্য কি শুধুই ডাক্তারদের পেশাদারিত্বে আঘাত, নাকি এটি এমন এক সত্য যা সংস্কার ছাড়া আড়াল করা যাবে না?

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আসিফ নজরুলের বক্তব্য : ডাক্তারদের পেশাদারিত্বের ওপর আঘাত নাকি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব চিত্র?

Update Time : ০৬:১২:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৫

9999 20250817142844

সম্প্রতি বিশিষ্ট আইনজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে চিকিৎসক সমাজকে ‘ওষুধ কোম্পানির দালাল’ আখ্যা দেন। তাঁর এই মন্তব্যে চিকিৎসক মহলে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, এটি শুধু অযৌক্তিক নয়, বরং চিকিৎসকদের আত্মমর্যাদা ও পেশাদারিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।

চিকিৎসকদের প্রতিক্রিয়া ক্ষোভ

ডা. রফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন, ডাক্তারি পেশা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে এখনো অসংখ্য অভিভাবক তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। সে দেশে একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সমাজের মতামত-নির্ধারক ব্যক্তিত্বের মুখে এ ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য আসলে তা জনমনে চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। তিনি মনে করিয়ে দেন, করোনাভাইরাস মহামারির সময় চিকিৎসক ও নার্সরা জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন। মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, এমনকি সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনেও চিকিৎসকরা শহীদ হয়েছেন, আহতদের সেবা দিয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। সেই ইতিহাস অস্বীকার করে গোটা চিকিৎসক সমাজকে ‘দালাল’ হিসেবে চিত্রিত করা ন্যূনতম সৌজন্যের মধ্যে পড়ে না।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবতা

তবে সমালোচনার মধ্যেও এক প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে—আসিফ নজরুল কি আসলেই মিথ্যা বলেছেন, নাকি বাস্তবতার একটি তিক্ত দিক সামনে এনেছেন? বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে ওষুধ কোম্পানির প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ওষুধ কোম্পানির পক্ষ থেকে অনেক সময় চিকিৎসকদের আর্থিক বা উপঢৌকন প্রণোদনা দিয়ে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড প্রেসক্রাইব করানো হয়। একইভাবে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে চাপ দেওয়া এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্যাকেজ প্রস্তাব করার অভিযোগও বহুবার এসেছে সংবাদমাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের রিপোর্টগুলোতেও এ ধরনের অনিয়মের উল্লেখ রয়েছে।

তবে এটি গোটা চিকিৎসক সমাজের চিত্র নয়। বাস্তবে দেশের বেশিরভাগ চিকিৎসক সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অপ্রতুল অবকাঠামো ও কম বেতনের মধ্যেও নিবেদিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট, অব্যবস্থাপনা, সীমিত সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও তাঁদের কাজ অবিস্মরণীয়। একদিকে কিছু অনিয়ম আছে, অন্যদিকে অসংখ্য ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গও রয়েছে। ফলে ঢালাওভাবে পুরো চিকিৎসক সমাজকে দোষারোপ করলে তা অন্যায়ই হয়।

দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন

ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক সমাজে অনিয়ম থাকলে তা সমাধান করতে হবে নীতি-প্রণয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে। কোনোভাবেই ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে সমাধান আসবে না। বরং এতে সাধারণ মানুষ চিকিৎসকদের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়বে, যা স্বাস্থ্য খাতের জন্য ক্ষতিকর। তাঁর প্রশ্ন, একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আসিফ নজরুল কি সচেতনভাবে বিতর্ক তৈরি করে সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করছেন? নাকি তিনি চিকিৎসকদের বদনাম করে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণকে প্রচারণা দিচ্ছেন?

আসিফ নজরুলের বক্তব্য নিঃসন্দেহে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, তাঁর বক্তব্য অতিরঞ্জিত ও অবমাননাকর। আবার অনেকে মনে করেন, তিনি স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব দুর্নীতিগ্রস্ত চিত্রটিকেই সামনে এনেছেন, যদিও তা বলার ধরন ছিল অনুপযুক্ত। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত একদিকে নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকদের ত্যাগে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে একটি অংশের অনিয়ম ও ব্যবসায়ীকরণে ক্ষতিগ্রস্ত। এই দ্বিমুখী বাস্তবতার মাঝেই জন্ম নেয় বিতর্ক।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্য কি শুধুই ডাক্তারদের পেশাদারিত্বে আঘাত, নাকি এটি এমন এক সত্য যা সংস্কার ছাড়া আড়াল করা যাবে না?