ভিসা বাতিলে অনিশ্চয়তায় ১৩০ ফিলিস্তিনি ছাত্রী: চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়াশোনার স্বপ্ন কি ভেস্তে যাবে?
- Update Time : ০৩:০০:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৮২ Time View

২০২৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গাজা উপত্যকার প্রায় ১৮৯ জন ফিলিস্তিনি ছাত্রীকে অন–অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল, যাতে তারা চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন–এ এসে পড়াশোনা করতে পারেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহায়তায় এই ছাত্রীদের গাজা থেকে জর্ডান হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়, আর বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পূর্ণ বৃত্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
কিন্তু জুন মাসে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসন হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ভিসা অনুমতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নির্দেশে বাতিল করা হয়েছে। লিখিতভাবে কোনো কারণ জানানো হয়নি। এ কারণে অন্তত ১৩০ জন ছাত্রী—যারা ভর্তি হওয়ার জন্য ব্যাগ গুছিয়ে অপেক্ষা করছিলেন—এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। আরও দুঃখজনক হলো, গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলার কারণে বৃত্তি পাওয়া অন্তত ৩০ জন ছাত্রী নিখোঁজ, যাদের হয়তো প্রাণহানি ঘটেছে কিংবা তারা অন্য কোথাও চলে গেছেন।
কূটনৈতিক জটিলতা ও অদৃশ্য চাপ
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ফিলিস্তিনি ছাত্রীদের নিয়ে এই পরিকল্পনা শুরু থেকেই একটি প্রভাবশালী মহলের বিরোধিতার মুখে পড়ে। তারা সরকারের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ করে যুক্তি দেয় যে, গাজার শিক্ষার্থীরা চাইলে বাংলাদেশের অন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনার সুযোগ পেতে পারেন—তাই তাদের এককভাবে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পাঠানোর যৌক্তিকতা নেই। একাধিক সূত্র এমনকি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই বাধার নেপথ্যে ঢাকায় ফিলিস্তিন দূতাবাসের অবস্থানও রয়েছে।
ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ রামাদান বলেছেন, ফিলিস্তিন সরকারের নীতি অনুযায়ী কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তিই গ্রহণযোগ্য। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন সেই স্বীকৃতি না পাওয়ায় তারা সেখানে শিক্ষার্থী পাঠাতে পারছেন না। তবে রাষ্ট্রদূত এটিও জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া অন্যান্য বৃত্তিকে তারা স্বাগত জানায় এবং সরকারের সহযোগিতায় শিক্ষার্থী আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহায়তা ও অবাক প্রতিক্রিয়া
এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় সহায়তা এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। তারা গাজা থেকে জর্ডানের কুইন আলিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ছাত্রীদের পৌঁছানোর জন্য ইউনিসেফের পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় করে এবং জর্ডান থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এমিরেটস এয়ারলাইনসের বিশেষ ফ্লাইটের প্রতিশ্রুতি দেয়। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে তারা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে অনুরোধ করে।
তবে অনুমতি দেওয়ার পর হঠাৎ বাতিলের সিদ্ধান্তে আমিরাতও বিস্মিত। এক কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, এই সিদ্ধান্ত কেবল মানবিক সহায়তার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেনি, বরং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেও অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছে।
প্রশ্নের মুখে ভিসা নীতি ও মানবিক অগ্রাধিকার
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও কামাল আহমেদ ফিলিস্তিন সফর শেষে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০২১ সালে আফগানিস্তানের ৬০০-এর বেশি ছাত্রী, এবং সিরিয়া ও ইয়েমেনের শিক্ষার্থীরা একই পদ্ধতিতে ভিসা পেয়েছেন—তখন সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের অনুমতি চাওয়া হয়নি। “ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেন?”—প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এদিকে গাজার শিক্ষার্থীরা ও তাদের পরিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইমেইলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ইসরায়েলি হামলায় প্রতিদিনই গাজায় পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে, ফলে প্রতিটি বিলম্ব নতুন প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করছে। এক ছাত্রী বার্তা পাঠিয়ে লিখেছেন—“আমরা বাংলাদেশে এসে পড়াশোনা করতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। এখনো কি আশা আছে?”










