হত্যার আগে গাজার শেষ বার্তা: শহিদ সাংবাদিক আনাস আল-শরীফের হৃদয়বিদারক চিঠি
- Update Time : ০৫:৫৭:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৩৯ Time View

ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় আরও এক মর্মান্তিক অধ্যায় রচিত হলো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার পাঁচজন সাহসী সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন সম্প্রতি এক ভয়াবহ বিমান হামলায়। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন আনাস জামাল আল-শরীফ—যিনি গাজার মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে বিশ্বের বিবেককে নাড়া দিচ্ছিলেন প্রতিদিন।
মৃত্যুর আগে তিনি রেখে গেছেন একটি আবেগঘন বার্তা—যা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাঁর শেষ ইচ্ছা ও জীবনের সারসংক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে। এই বার্তাটি তিনি নিজের শাহাদাতের পর প্রকাশের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর পরিবার ও সহকর্মীরা সেই ইচ্ছা পূরণ করেছেন।
শৈশব থেকে সংগ্রাম, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সত্যের পক্ষে
চিঠিতে আনাস লিখেছেন, শৈশব থেকেই তিনি জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের অলি-গলিতে বেড়ে উঠেছেন। দারিদ্র্য, নিপীড়ন ও অবরোধের মাঝেও তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নিজের জীবন উৎসর্গ করবেন জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য। তাঁর স্বপ্ন ছিল একদিন পরিবারের সঙ্গে দখলকৃত আসকালান শহরে (আল-মাজদাল) ফিরে যাওয়া। কিন্তু তিনি জানতেন, আল্লাহর ফয়সালা ছাড়া কিছুই ঘটবে না—এবং তাঁর নিয়তি হয়তো শহীদের মৃত্যু।
তিনি জানান, জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি ক্ষতি, কষ্ট ও বেদনা সয়েছেন। তবুও কখনো সত্যকে বিকৃত করেননি, কিংবা মিথ্যার কাছে মাথা নত করেননি।
বিশ্ববাসীর উদ্দেশে তীব্র আহ্বান
আনাস তাঁর শেষ চিঠিতে সেইসব মানুষকে তীব্র সমালোচনা করেছেন, যারা ফিলিস্তিনের রক্তপাতের সময় নীরব থেকেছে, কিংবা শিশু ও নারীর হত্যা থামাতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেছেন, “আল্লাহ যেন তাঁদের বিরুদ্ধে সাক্ষী থাকেন।”
তিনি বিশ্ব মুসলিম ও স্বাধীনতাপ্রিয় সকল মানুষের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন—গাজা ও এর জনগণকে ভুলে না যেতে। এই ভূমি ও জনগণের মুক্তির জন্য যেন কণ্ঠস্বর উঁচু রাখা হয়, সীমান্ত ও ভয় যেন সত্য বলার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
পরিবারকে পৃথিবীর মানুষের হাতে
চিঠিতে সবচেয়ে আবেগঘন অংশ ছিল তাঁর পরিবারের প্রতি বিদায়বার্তা। তিনি তাঁর ছোট্ট মেয়ে শাম, ছেলে সালাহ, মমতাময়ী মা, এবং ধৈর্যশীলা স্ত্রী উম্মে সালাহ (বায়ান)-কে বিশ্বের মানুষের কাছে ‘আমানত’ হিসেবে রেখে যান। তিনি আহ্বান জানান, যেন সবাই তাঁদের পাশে থাকে, তাঁদের জন্য আল্লাহর পর দ্বিতীয় আশ্রয় হয়।
তিনি স্ত্রীকে তুলনা করেছেন “জলপাই গাছের কাণ্ডের” সঙ্গে—যা ঝড়-ঝাপটা সহ্য করেও ভাঙে না, বাঁকেও না। যুদ্ধ তাঁদের দীর্ঘদিন আলাদা রেখেছে, তবুও স্ত্রী ঈমান ও ধৈর্য নিয়ে সংসারের দায়িত্ব পালন করেছেন।
আল্লাহর কাছে শহীদের মর্যাদা কামনা
আনাস শেষ বার্তায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন তাঁকে শহীদদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য, অতীত ও ভবিষ্যতের সব গুনাহ ক্ষমা করার জন্য, এবং তাঁর রক্তকে যেন আলোর মতো ব্যবহার করা হয়—যা তাঁর জনগণ ও পরিবারকে স্বাধীনতার পথে পথপ্রদর্শক হবে।
শেষ লাইনে তিনি অনুরোধ করেছেন, “গাজাকে ভুলে যেও না… আর তোমাদের আন্তরিক প্রার্থনায় যেন আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেন ও কবুল করে নেন, সেই দোয়া করতে ভুলো না।”










