সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মামলা — ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলায় বহিষ্কৃত মেডিকেল শিক্ষার্থীর স্বপ্ন রক্ষার লড়াই

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৬:১৯:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১৭৭ Time View

1 20250810161704

1 20250810161704

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টাভিত্তিক মর্যাদাপূর্ণ এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন উমাইমা মোহাম্মদ। লক্ষ্য ছিল দুই উচ্চশিক্ষা ডিগ্রি অর্জন—একদিকে চিকিৎসাশাস্ত্রে (মেডিকেল ডিগ্রি) পড়াশোনা করে একজন দক্ষ প্রাথমিক পরিচর্যা চিকিৎসক হওয়া, অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি করে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বিদ্যমান কাঠামোগত সহিংসতার ওপর গবেষণামূলক অবদান রাখা।

কিন্তু ২০২৪ সালে হঠাৎ করেই সবকিছু ভেঙে পড়ে। এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিন থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়—যা তার ভাষায় ছিল “একটি পেশাগত মৃত্যুদণ্ড”। কারণ, গাজা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইসরায়েলের জন্য স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করা এক অনুষদ সদস্যের কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করেছিলেন তিনি। যদিও তিনি কখনো ওই শিক্ষকের নাম প্রকাশ্যে উল্লেখ করেননি, তবুও প্রশাসন বিষয়টিকে ‘অশোভন মন্তব্য’ হিসেবে গণ্য করে কঠোর শাস্তি দেয়।

গাজা যুদ্ধ, প্রতিবাদ বহিষ্কার
ঘটনার সূত্রপাত গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময়। সেই সময়ে এমোরি মেডিকেল স্কুলের এক শিক্ষক ইসরায়েলে গিয়ে রিজার্ভ স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে সেবা দেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে তিনি আবার পাঠদান শুরু করেন। উমাইমা তার কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেন—যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে ২০২৭-২০২৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২৯ সালে ডিগ্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়।

শুধু তাই নয়, এই বহিষ্কারাদেশ তার স্থায়ী একাডেমিক রেকর্ডে যুক্ত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নকে কার্যত অসম্ভব করে তুলবে। উমাইমা বলেন, “একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর স্থায়ী রেকর্ডে বহিষ্কারের দাগ মানেই চিকিৎসা পেশায় প্রবেশের সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া।”

বৈষম্যের অভিযোগ মামলা
৪ আগস্ট তিনি জর্জিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড এবং মেডিকেল স্কুলের ডিন ড. জন উইলিয়াম এলির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন—বৈষম্য, যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাব, এবং মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন। মুসলিম নাগরিক অধিকার সংস্থা ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস’ (CAIR) ও আইনজীবী জোনাথন ওয়ালেস তার পক্ষে যৌথভাবে মামলা পরিচালনা করছেন।

এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় মিডল ইস্ট আই-কে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

শিক্ষাগত মানসিক প্রভাব
উমাইমা জানান, এই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত তার জীবনে ভয়াবহ একাডেমিক, মানসিক ও বস্তুগত প্রভাব ফেলেছে। তিনি ক্যাম্পাসে গিয়ে উদ্বিগ্ন বোধ করতেন, এমনকি কিছু সহপাঠী তার প্রতি সহিংসতার হুমকি দিয়ে রসিকতা করত। এতে তিনি শারীরিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন।

তার ভাষায়, “আমরা ক্যাম্পাসে যে সহিংসতা দেখেছি এবং ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যে হামলা হয়েছে, তা বাস্তবতার বাইরে নয়।”

শাস্তির কারণে তিনি তার সমাজবিজ্ঞানের পিএইচডি প্রোগ্রামে ছয় মাস পিছিয়ে গেছেন। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তার চিকিৎসক হওয়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্নে।

রাজনৈতিক নৈতিক মাত্রা
উমাইমা বিশ্বাস করেন, তার বহিষ্কার সিদ্ধান্তের পেছনে একই বর্ণবাদী ও দমনমূলক মানসিকতা কাজ করেছে, যা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের যুক্তির সাথে মিলে যায়। “যেহেতু তারা আমাদের ঘরে বোমা ফেলতে পারে না, তাই তারা আমাদের ক্যারিয়ার ও জীবিকা ধ্বংস করার চেষ্টা করে,”—তিনি মন্তব্য করেন।

তবে তিনি এটাও বলেন যে, তার ব্যক্তিগত ক্ষতি সত্ত্বেও গাজার জনগণের কষ্ট তুলনাহীনভাবে বেশি। “আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, গাজার মানুষই সবচেয়ে বেশি হারাচ্ছে, ত্যাগ স্বীকার করছে, এবং কষ্ট পাচ্ছে।”

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মামলা — ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলায় বহিষ্কৃত মেডিকেল শিক্ষার্থীর স্বপ্ন রক্ষার লড়াই

Update Time : ০৬:১৯:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ অগাস্ট ২০২৫

1 20250810161704

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টাভিত্তিক মর্যাদাপূর্ণ এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন উমাইমা মোহাম্মদ। লক্ষ্য ছিল দুই উচ্চশিক্ষা ডিগ্রি অর্জন—একদিকে চিকিৎসাশাস্ত্রে (মেডিকেল ডিগ্রি) পড়াশোনা করে একজন দক্ষ প্রাথমিক পরিচর্যা চিকিৎসক হওয়া, অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি করে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বিদ্যমান কাঠামোগত সহিংসতার ওপর গবেষণামূলক অবদান রাখা।

কিন্তু ২০২৪ সালে হঠাৎ করেই সবকিছু ভেঙে পড়ে। এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিন থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়—যা তার ভাষায় ছিল “একটি পেশাগত মৃত্যুদণ্ড”। কারণ, গাজা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইসরায়েলের জন্য স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করা এক অনুষদ সদস্যের কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করেছিলেন তিনি। যদিও তিনি কখনো ওই শিক্ষকের নাম প্রকাশ্যে উল্লেখ করেননি, তবুও প্রশাসন বিষয়টিকে ‘অশোভন মন্তব্য’ হিসেবে গণ্য করে কঠোর শাস্তি দেয়।

গাজা যুদ্ধ, প্রতিবাদ বহিষ্কার
ঘটনার সূত্রপাত গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময়। সেই সময়ে এমোরি মেডিকেল স্কুলের এক শিক্ষক ইসরায়েলে গিয়ে রিজার্ভ স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে সেবা দেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে তিনি আবার পাঠদান শুরু করেন। উমাইমা তার কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেন—যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে ২০২৭-২০২৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২৯ সালে ডিগ্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়।

শুধু তাই নয়, এই বহিষ্কারাদেশ তার স্থায়ী একাডেমিক রেকর্ডে যুক্ত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নকে কার্যত অসম্ভব করে তুলবে। উমাইমা বলেন, “একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর স্থায়ী রেকর্ডে বহিষ্কারের দাগ মানেই চিকিৎসা পেশায় প্রবেশের সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া।”

বৈষম্যের অভিযোগ মামলা
৪ আগস্ট তিনি জর্জিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড এবং মেডিকেল স্কুলের ডিন ড. জন উইলিয়াম এলির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন—বৈষম্য, যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাব, এবং মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন। মুসলিম নাগরিক অধিকার সংস্থা ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস’ (CAIR) ও আইনজীবী জোনাথন ওয়ালেস তার পক্ষে যৌথভাবে মামলা পরিচালনা করছেন।

এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় মিডল ইস্ট আই-কে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

শিক্ষাগত মানসিক প্রভাব
উমাইমা জানান, এই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত তার জীবনে ভয়াবহ একাডেমিক, মানসিক ও বস্তুগত প্রভাব ফেলেছে। তিনি ক্যাম্পাসে গিয়ে উদ্বিগ্ন বোধ করতেন, এমনকি কিছু সহপাঠী তার প্রতি সহিংসতার হুমকি দিয়ে রসিকতা করত। এতে তিনি শারীরিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন।

তার ভাষায়, “আমরা ক্যাম্পাসে যে সহিংসতা দেখেছি এবং ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যে হামলা হয়েছে, তা বাস্তবতার বাইরে নয়।”

শাস্তির কারণে তিনি তার সমাজবিজ্ঞানের পিএইচডি প্রোগ্রামে ছয় মাস পিছিয়ে গেছেন। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তার চিকিৎসক হওয়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্নে।

রাজনৈতিক নৈতিক মাত্রা
উমাইমা বিশ্বাস করেন, তার বহিষ্কার সিদ্ধান্তের পেছনে একই বর্ণবাদী ও দমনমূলক মানসিকতা কাজ করেছে, যা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের যুক্তির সাথে মিলে যায়। “যেহেতু তারা আমাদের ঘরে বোমা ফেলতে পারে না, তাই তারা আমাদের ক্যারিয়ার ও জীবিকা ধ্বংস করার চেষ্টা করে,”—তিনি মন্তব্য করেন।

তবে তিনি এটাও বলেন যে, তার ব্যক্তিগত ক্ষতি সত্ত্বেও গাজার জনগণের কষ্ট তুলনাহীনভাবে বেশি। “আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, গাজার মানুষই সবচেয়ে বেশি হারাচ্ছে, ত্যাগ স্বীকার করছে, এবং কষ্ট পাচ্ছে।”