জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্ষোভ — “শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় এআই ব্যবহার করছে, প্রিন্সিপাল বসে চা খাচ্ছেন”
- Update Time : ০৫:৫৯:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৬৯ Time View

বাংলাদেশের বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন উপাচার্য এ এস এম আমানুল্লাহ। তার মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থী তৈরি করছে না, বরং কেবল ‘পরীক্ষার্থী’ তৈরি করছে—যাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের মধ্যে কোনো সেতুবন্ধন নেই।
রোববার (১০ আগস্ট) সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৩৬৫ দিন’ শীর্ষক সংলাপে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বলতা, পরীক্ষার অব্যবস্থা, শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা ও শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সংযোগহীন শিক্ষাব্যবস্থার নানা দিক তুলে ধরেন উপাচার্য।
এআই–নির্ভর উত্তর লেখা ও প্রিন্সিপালের উদাসীনতা
অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, সম্প্রতি ঢাকার এক কলেজে পরিদর্শনে গিয়ে তিনি অবাক হয়ে দেখেন—পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীরা খোলাখুলিভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অ্যাপের সাহায্যে প্রশ্নের উত্তর লিখছে। অথচ দায়িত্বে থাকা প্রিন্সিপাল নির্বিকারভাবে বসে চা খাচ্ছেন। “এমন ভয়াবহ অবস্থা চলছে যে দায়িত্বশীল শিক্ষক পাওয়া দুষ্কর,”—বলেই তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
পাঠ্যক্রমে শিল্পক্ষেত্রের সংযোগহীনতা
উপাচার্যের মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষাপদ্ধতিতে শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে প্রায় কোনো সংযোগ নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা বইনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে না। এই disconnect বা বিচ্ছিন্নতা দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাজারে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য
তিনি জানান, অনেক কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক দর্শনের উত্তরপত্রের নম্বর ইনপুট দেন, যা স্পষ্টতই একাডেমিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের উদাহরণ। আবার ল্যাবরেটরি না থাকা সত্ত্বেও বহু কলেজে রসায়ন, পদার্থ ও জীববিজ্ঞানে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং পূর্ণ নম্বরও দেওয়া হয়। এমনকি যেখানে ল্যাব আছে, সেখানেও প্রায়শই কোনো কার্যক্রম হয় না।
নিয়োগদাতাদের
বড় কোম্পানিগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের নিয়োগ দিলেও তাদের দক্ষতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, “এমন স্নাতকরা সহজেই ম্যানিপুলেটেড হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের কাজে ব্যবহার করা যায়, যা নিয়োগদাতাদের জন্য লাভজনক হলেও দেশের জন্য ক্ষতিকর।”
সংলাপে উপস্থিত ব্যক্তিত্বরা
এই সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স প্রমুখ। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, যেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছরের কর্মপরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য প্রভাব
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, উপাচার্যের এই বক্তব্য শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নানা ত্রুটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এআই-এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, শিক্ষক-প্রশাসনের উদাসীনতা, পাঠ্যক্রমের পুরোনো কাঠামো এবং বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার অভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনে এটি একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।











