আওয়ামী লীগ কর্মীদের গেরিলা প্রশিক্ষণ: অভিযুক্ত মেজর সাদিকের পর স্ত্রী সুমাইয়া জাফরিন আটক
- Update Time : ১১:১৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ অগাস্ট ২০২৫
- / ২০৬ Time View

নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গোপনে গেরিলা ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর (বরখাস্ত) সাদিকের স্ত্রী সুমাইয়া জাফরিনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বুধবার (৬ আগস্ট) রাতে ডিবির একটি বিশেষ দল তাকে রাজধানীর একটি স্থান থেকে হেফাজতে নেয় এবং মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম।
গোপন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, সুমাইয়া জাফরিন শুধুমাত্র অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সাদিকের স্ত্রী নন, বরং তিনি স্বামীকে সহযোগিতা করে গেরিলা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সুমাইয়ার দায়িত্ব ছিল প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা প্রস্তুত, প্রশিক্ষণের সময় ও স্থান নির্ধারণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতে যোগাযোগ রক্ষা এবং সাংগঠনিক সমন্বয় বজায় রাখা।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি সুসংগঠিত ও গোপন রাজনৈতিক-সামরিক নেটওয়ার্ক তৈরির প্রচেষ্টায় ছিল এই দম্পতি, যার মাধ্যমে তারা রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ দলীয় নেতাকর্মীদের ‘সশস্ত্র প্রতিরোধের’ উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনায় নিয়োজিত ছিলেন।
গ্রেপ্তার, তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া
এই ঘটনায় ইতোমধ্যে রাজধানীর ভাটারা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়, বসুন্ধরা সংলগ্ন একটি কনভেনশন সেন্টারে গোপনে বৈঠক করছিলেন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ২২ জন নেতাকর্মী। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে অনেকেই সাম্প্রতিককালে নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত। ধারণা করা হচ্ছে, এই সভার উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণের অগ্রগতি পর্যালোচনা।
এর আগে, ১ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে মেজর সাদিকের বিরুদ্ধে ‘গোপনে গেরিলা প্রশিক্ষণ ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে’ জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। ১৭ জুলাই তাকে উত্তরার বাসা থেকে আটক করে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয় এবং এ বিষয়ে একটি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়। আইএসপিআর জানিয়েছে, তদন্ত শেষে মেজর সাদিকের বিরুদ্ধে সেনা আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুশীল সমাজ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
এই ঘটনায় দেশের সুশীল সমাজ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে মনে করছেন, ক্ষমতাসীন দলের একাংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের এমন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বিপজ্জনক সংকেত বহন করে। বিশেষ করে, সামরিক পটভূমি সম্পন্ন কোনো কর্মকর্তার নেতৃত্বে এমন কার্যক্রম পরিচালনা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হতে পারে।
সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম শাহজাহান বলেন, “গেরিলা প্রশিক্ষণ মানেই অস্ত্র, কৌশল ও সহিংস প্রতিরোধের প্রস্তুতি—এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এমন কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করতে হবে।”
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যত করণীয়
এ ঘটনায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভক্তি, উপদলীয় কর্মকাণ্ড এবং ‘আত্মরক্ষামূলক রাজনীতি’র দৃষ্টান্ত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদি সত্যিই কোনো অংশ ‘প্রতিরোধ’ বা ‘ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অস্থিরতা’ মাথায় রেখে গোপনে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করে থাকে, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক বিপজ্জনক মোড় নির্দেশ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না; এ ধরনের সংগঠিত তৎপরতার পেছনে থাকা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিদেশি যোগসূত্র তদন্ত করে প্রকাশ্যে আনতে হবে। তবেই ভবিষ্যতে এ ধরনের চক্রান্ত প্রতিরোধ সম্ভব হবে।










