জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৪ শিক্ষার্থী আজীবন বহিষ্কার, ৭৩ জনের সনদ বাতিল
- Update Time : ০৩:০৪:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৬৭ Time View

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ২০২৪ সালের ১৪ থেকে ১৭ জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলনকারীদের ওপর সংঘটিত হামলায় সরাসরি জড়িত থাকার দায়ে ৬৪ জন শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পাশাপাশি, আরও ৪৬ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার এবং ৭৩ জন সাবেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা সনদ বাতিল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের একটি বিশেষ সভায় গৃহীত হয়, যা শেষ হয় সোমবার (৪ আগস্ট) দিবাগত রাত সাড়ে ৩টায়।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান সাংবাদিকদের জানান, মোট ২২৯ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৩০ জন বর্তমানে অধ্যয়নরত এবং ৯৯ জন সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৪ জনকে আজীবন বহিষ্কার, ৩৭ জনকে দুই বছর, আটজনকে এক বছর এবং একজনকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।
ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা এবং আইনি প্রেক্ষাপট
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বহিষ্কৃত ৬৪ জন শিক্ষার্থীই নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল এবং ক্যাম্পাসে সহিংসতা সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা পালন করে। তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আব্দুর রব। তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সিন্ডিকেট এ কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সাবেকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন
সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৩ জনের শিক্ষা সনদ সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয়েছে এবং অপর ৬ জনের সনদ দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া ক্যাম্পাসে সংঘটিত সহিংসতায় অংশগ্রহণকারী বহিরাগত সন্ত্রাসী এবং পুলিশের ভূমিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালার আওতাবহির্ভূত হওয়ায়, তাদের বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) পাঠানো হবে বলে উপাচার্য জানিয়েছেন।
অব্যাহতি ও বিতর্ক
শাস্তির তালিকায় থাকা ৪০ জন শিক্ষার্থীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে—যাদের মধ্যে ২০ জন বর্তমান এবং ২০ জন সাবেক শিক্ষার্থী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে উপাচার্য এই অব্যাহতির যুক্তি ব্যাখ্যা করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন এবং বলেন, “এ বিষয়ে তদন্ত কমিটিই ব্যাখ্যা দিতে পারবে।”
পরে অধিকতর তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুর রব স্পষ্ট করে বলেন, “এই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আমরা তদন্তে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষ্য পাইনি। ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণেও তাদের সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।”
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট ও প্রতিক্রিয়া
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শৃঙ্খলা ও সহিংসতা দমনের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। তবে ছাত্র সমাজ, অভিভাবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক মনে করেন, এ ধরনের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার সংস্কৃতি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তবে তা হতে হবে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে ভিত্তিক।
শেষ কথা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নজির বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসে বিরল। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির নামে সহিংসতা ও অপকর্ম রোধে কড়া বার্তা হতে পারে। তবে সময়ই বলে দেবে, এই ব্যবস্থা কতটা ন্যায়সংগত, দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে সক্ষম এবং ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর হবে।










