সাক্ষীর জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ: হাসপাতালে শেখ হাসিনার ‘নো রিলিজ, নো ট্রিটমেন্ট’ নির্দেশ
- Update Time : ০৬:০০:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ অগাস্ট ২০২৫
- / ২১২ Time View

জুলাই মাসের বহুল আলোচিত গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে হাজির হওয়া শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল ইমরান। তিনি অভিযোগ করেছেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং উপস্থিত হয়ে তার চিকিৎসা বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং বলেন, “নো রিলিজ, নো ট্রিটমেন্ট”—অর্থাৎ তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া হবে না এবং চিকিৎসাও দেওয়া হবে না।
সোমবার (৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দিতে এসে ইমরান বলেন, গত বছরের ১৯ জুলাই বিজয়নগরের পানির ট্যাংক এলাকায় একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণের সময় পুলিশের গুলিতে তিনি আহত হন। গুলি লাগে তার বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচে। পরবর্তীতে তাকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল), যেখানে তার অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি চলছিল।
জবানবন্দিতে ইমরান বলেন, ঘটনার এক সপ্তাহ পর, ২৬ বা ২৭ জুলাই সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পঙ্গু হাসপাতালে পরিদর্শনে যান। পরিদর্শনের সময় হাসিনা সরাসরি তার বেডের কাছে গিয়ে কথা বলেন। ইমরান তাকে ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন করলে শেখ হাসিনা বলেন, “আপা বলো।” এরপর তিনি জানতে চান, ইমরান কোথায় পড়েন, হলে থাকেন কি না, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পেছনের কারণ কী ইত্যাদি।
তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পারেন আমি আন্দোলনকারী। তখন তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তোমাকে কি পুলিশ গুলি করেছে?’ আমি সরাসরি উত্তর দিই—হ্যাঁ, পুলিশের পোশাকধারীরা গুলি করেছে।” ইমরান দাবি করেন, তখন হাসিনা আরও চার-পাঁচজন আহতের সঙ্গে কথা বলেন এবং হাসপাতাল ত্যাগের সময় হেল্প ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে ‘নো রিলিজ, নো ট্রিটমেন্ট’ নির্দেশ দেন, যা তিনি নিজ কানে শুনেছেন।
ইমরান বলেন, “তখন বুঝতে পারিনি এর মানে কী। পরে দেখি, আমার অস্ত্রোপচার হচ্ছে না। বাইরে থেকে ওষুধ আনতে পারছি না। আমার বাবা আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাধা দেয়।” তিনি বলেন, “তখন বুঝি, আমার ওপর সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে। এমনকি আমার পা কেটে দিয়ে কারাগারে পাঠানোর চেষ্টা চলছিল।”
এই ঘটনার জন্য ইমরান তিনজন শীর্ষ নেতাকে দায়ী করেন—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
এর আগের দিন, এই মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন মাইক্রোবাসচালক খোকন চন্দ্র বর্মণ, যিনি আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী পরিবহনে জড়িত ছিলেন বলে দাবি করেন।
প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান বর্তমানে পলাতক। তবে মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার হওয়া আসামি, পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ইতোমধ্যে আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন।
এই মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন মোড় নিয়েছে, যেখানে ক্ষমতায় থাকা বা এক সময় শাসন করা শীর্ষ নেতৃত্বদের বিরুদ্ধে সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি এখন দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে রয়েছে।










