সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একসঙ্গে জীবন, একসঙ্গেই মৃত্যু: সৌদি প্রবাসী ৩ বন্ধুর হৃদয়বিদারক পরিণতি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:১০:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১৪৬ Time View

87833cf6eb7315148ecb511020b0473a 68903033cb1e5

87833cf6eb7315148ecb511020b0473a 68903033cb1e5

সৌদি আরবে কর্মরত তিনজন বন্ধুর দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবন, একে অপরের সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব আর একত্রে দেশে ফেরার আনন্দের মুহূর্ত—সবকিছু মুহূর্তেই থেমে গেল এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। কয়েক মাস আগে ছুটিতে দেশে আসা তিন প্রবাসী বন্ধু ফের সৌদিতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আর ফেরা হলো না তাদের। দেশে বেড়াতে গিয়ে প্রাণ গেল একসঙ্গে, একই সঙ্গে—যা পুরো এলাকায় এনে দিয়েছে শোকের ছায়া।

রোববার (৩ আগস্ট) বিকেলে ঘুরতে বের হয়েছিলেন তিন বন্ধু—লোকমান হোসেন (২৯), তুহিন হাসান (২৮) ও সুমন হোসেন (২৮)। তারা সবাই সৌদি আরবের একই এলাকায় কর্মরত ছিলেন। একসঙ্গে থাকা, কাজ করা, এবং এবার দেশে ফিরে একসঙ্গে সময় কাটানো—সবই চলছিল স্বাভাবিক নিয়মে। কিন্তু বিজয়নগর উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রামপুর এলাকায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা তাদের জীবন শেষ করে দেয় অকস্মাৎ।

দুর্ঘটনার বর্ণনা

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন বিকেলে একটি মোটরসাইকেলে চড়ে চান্দুরার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন সুমন, লোকমান ও তুহিন। বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য একটি মোটরসাইকেলে ছিলেন বিজয়নগরের আকরাম হোসেন ও রংপুরের মনিরুজ্জামান। হঠাৎই দুই মোটরসাইকেলের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সেই মুহূর্তে পেছন দিক থেকে দ্রুতগতির একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা দুই মোটরসাইকেলকেই ধাক্কা দিলে দুর্ঘটনাটি ভয়াবহ রূপ নেয়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৪ জন, পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়।

মৃতদের পরিচয়

নিহত তিন প্রবাসীর মধ্যে লোকমান ও তুহিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়নের মৈন্দ গ্রামের বাসিন্দা। আর সুমন হোসেনের বাড়ি সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের বাড়িউড়া গ্রামে। এই তিনজনের বন্ধুত্ব বহুদিনের। শুধু প্রবাসেই নয়, দেশে এসেও তারা একত্রে সময় কাটাতেন।

লোকমান হোসেন মাত্র ১৭ দিন আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর পরিবারের সবাই এখনও বিয়ের আনন্দে বিভোর ছিল। কিন্তু সেই ঘরেই এখন চলছে আহাজারি। এই অকাল মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। তুহিন ও সুমনের পরিবারও একইভাবে দিশেহারা হয়ে গেছে।

শোকস্তব্ধ গ্রামবাসী প্রতিবেশীরা

বাড়িউড়া গ্রামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ওরা সব সময় একসঙ্গে থাকত। বিদেশেও, দেশেও—সব কাজ একসঙ্গেই করত। এমন একসঙ্গে চলে যাবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।” একই কথা বলেছেন মৈন্দ গ্রামের লোকজনও। পুরো এলাকায় এখন শোকের আবহ। কারও মুখে হাসি নেই, সবার চোখে জল।

পুলিশের বক্তব্য

খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, “দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। সেখানে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করি এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান।”

অকাল মৃত্যু সমাজের করণীয়

এই ঘটনাটি দেশের চলমান সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির করুণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। বছরজুড়েই সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য প্রাণ ঝরে যায়। বিশেষত প্রবাসীরা যখন দীর্ঘ সময় পরে দেশে এসে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে চান, তখন এমন দুর্ঘটনা তাদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনটি পরিবার হারাল তাদের প্রিয় সন্তানকে, একজন নববধূ হারাল তার স্বামীকে।

এই করুণ মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়—নিরাপদ সড়কের দাবিটি এখনো কতটা প্রাসঙ্গিক। একই সঙ্গে এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি সতর্ক বার্তা, যেন আমরা অবিলম্বে সড়ক পরিবহন নীতিমালা, গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

শেষ কথা

একসঙ্গে সৌদিপ্রবাস, একসঙ্গে জীবনযাপন, এবং শেষমেশ একসঙ্গেই না-ফেরার দেশে পাড়ি—এই তিন বন্ধুর গল্প আজ সারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাব্যাপী কান্নার এক অধ্যায় হয়ে রইল। তারা হয়তো আর কখনো প্রবাসে ফিরতে পারবে না, কিন্তু তাদের স্মৃতি আজীবন বয়ে বেড়াবে পরিবার ও এলাকাবাসীর হৃদয়ে।

সৌদি ফেরার টিকিট থাকলেও, ফিরতে হলো কফিনে করেএটাই হয়তো জীবনের নির্মম পরিণতি।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

একসঙ্গে জীবন, একসঙ্গেই মৃত্যু: সৌদি প্রবাসী ৩ বন্ধুর হৃদয়বিদারক পরিণতি

Update Time : ১১:১০:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ অগাস্ট ২০২৫

87833cf6eb7315148ecb511020b0473a 68903033cb1e5

সৌদি আরবে কর্মরত তিনজন বন্ধুর দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবন, একে অপরের সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব আর একত্রে দেশে ফেরার আনন্দের মুহূর্ত—সবকিছু মুহূর্তেই থেমে গেল এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। কয়েক মাস আগে ছুটিতে দেশে আসা তিন প্রবাসী বন্ধু ফের সৌদিতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আর ফেরা হলো না তাদের। দেশে বেড়াতে গিয়ে প্রাণ গেল একসঙ্গে, একই সঙ্গে—যা পুরো এলাকায় এনে দিয়েছে শোকের ছায়া।

রোববার (৩ আগস্ট) বিকেলে ঘুরতে বের হয়েছিলেন তিন বন্ধু—লোকমান হোসেন (২৯), তুহিন হাসান (২৮) ও সুমন হোসেন (২৮)। তারা সবাই সৌদি আরবের একই এলাকায় কর্মরত ছিলেন। একসঙ্গে থাকা, কাজ করা, এবং এবার দেশে ফিরে একসঙ্গে সময় কাটানো—সবই চলছিল স্বাভাবিক নিয়মে। কিন্তু বিজয়নগর উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রামপুর এলাকায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা তাদের জীবন শেষ করে দেয় অকস্মাৎ।

দুর্ঘটনার বর্ণনা

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন বিকেলে একটি মোটরসাইকেলে চড়ে চান্দুরার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন সুমন, লোকমান ও তুহিন। বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য একটি মোটরসাইকেলে ছিলেন বিজয়নগরের আকরাম হোসেন ও রংপুরের মনিরুজ্জামান। হঠাৎই দুই মোটরসাইকেলের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সেই মুহূর্তে পেছন দিক থেকে দ্রুতগতির একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা দুই মোটরসাইকেলকেই ধাক্কা দিলে দুর্ঘটনাটি ভয়াবহ রূপ নেয়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৪ জন, পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়।

মৃতদের পরিচয়

নিহত তিন প্রবাসীর মধ্যে লোকমান ও তুহিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়নের মৈন্দ গ্রামের বাসিন্দা। আর সুমন হোসেনের বাড়ি সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের বাড়িউড়া গ্রামে। এই তিনজনের বন্ধুত্ব বহুদিনের। শুধু প্রবাসেই নয়, দেশে এসেও তারা একত্রে সময় কাটাতেন।

লোকমান হোসেন মাত্র ১৭ দিন আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর পরিবারের সবাই এখনও বিয়ের আনন্দে বিভোর ছিল। কিন্তু সেই ঘরেই এখন চলছে আহাজারি। এই অকাল মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। তুহিন ও সুমনের পরিবারও একইভাবে দিশেহারা হয়ে গেছে।

শোকস্তব্ধ গ্রামবাসী প্রতিবেশীরা

বাড়িউড়া গ্রামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ওরা সব সময় একসঙ্গে থাকত। বিদেশেও, দেশেও—সব কাজ একসঙ্গেই করত। এমন একসঙ্গে চলে যাবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।” একই কথা বলেছেন মৈন্দ গ্রামের লোকজনও। পুরো এলাকায় এখন শোকের আবহ। কারও মুখে হাসি নেই, সবার চোখে জল।

পুলিশের বক্তব্য

খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, “দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। সেখানে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করি এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান।”

অকাল মৃত্যু সমাজের করণীয়

এই ঘটনাটি দেশের চলমান সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির করুণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। বছরজুড়েই সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য প্রাণ ঝরে যায়। বিশেষত প্রবাসীরা যখন দীর্ঘ সময় পরে দেশে এসে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে চান, তখন এমন দুর্ঘটনা তাদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনটি পরিবার হারাল তাদের প্রিয় সন্তানকে, একজন নববধূ হারাল তার স্বামীকে।

এই করুণ মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়—নিরাপদ সড়কের দাবিটি এখনো কতটা প্রাসঙ্গিক। একই সঙ্গে এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি সতর্ক বার্তা, যেন আমরা অবিলম্বে সড়ক পরিবহন নীতিমালা, গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

শেষ কথা

একসঙ্গে সৌদিপ্রবাস, একসঙ্গে জীবনযাপন, এবং শেষমেশ একসঙ্গেই না-ফেরার দেশে পাড়ি—এই তিন বন্ধুর গল্প আজ সারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাব্যাপী কান্নার এক অধ্যায় হয়ে রইল। তারা হয়তো আর কখনো প্রবাসে ফিরতে পারবে না, কিন্তু তাদের স্মৃতি আজীবন বয়ে বেড়াবে পরিবার ও এলাকাবাসীর হৃদয়ে।

সৌদি ফেরার টিকিট থাকলেও, ফিরতে হলো কফিনে করেএটাই হয়তো জীবনের নির্মম পরিণতি।