আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে পারলেই মিলবে চূড়ান্ত মুক্তি: মির্জা ফখরুল
- Update Time : ১০:২৮:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৮৪ Time View

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “বাংলাদেশ আপাতত এক ভয়ংকর ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে। তবে এই মুক্তি তখনই চূড়ান্ত হবে, যখন আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করা যাবে।” শুক্রবার (১ আগস্ট) বিকেলে উত্তরা আজমপুরে বিএনপির মহানগর উত্তর শাখা আয়োজিত এক জনসভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। এই সমাবেশের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে শহীদদের স্মরণ ও তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ।
মির্জা ফখরুল বলেন, “গত দেড় দশক ধরে যারা দেশ লুট করেছে, ব্যাংক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, মানুষের বাকস্বাধীনতা ও ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে, তাদের সাথে কোনো আপস নয়।” তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, “এই অপশক্তিকে আর কোনোভাবেই রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরতে দেয়া যাবে না। তারা ক্ষমতা হারালেও এখনো চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে—সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “জনগণ যেভাবে খালেদা জিয়ার ওপর আস্থা রেখেছে, আজ সেই আস্থা তারেক রহমানের ওপরও দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। মানুষ অপেক্ষা করছে, কবে তারেক রহমান দেশে ফিরে নেতৃত্ব দেবেন। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন তিনি শিগগিরই দেশে ফিরে এসে আমাদের সংগঠিত করেন এবং নতুন নেতৃত্বে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলেন।”
নতুন বাংলাদেশ গঠনের রূপরেখা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, “তারেক রহমানের পরিকল্পনায় ‘ফার্মার্স কার্ড’, ‘স্বাস্থ্য কার্ড’, ‘ফ্যামিলি কার্ড’সহ নানা সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা রাখবে।”
তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে কেউ গরিব থাকবে না, যেখানে ভোটাধিকার ও মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকবে জবাবদিহিতা। এ জন্য প্রয়োজন একটি গণতান্ত্রিক, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও একটি নির্বাচিত সরকার।”
মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ট্যারিফ ইস্যু নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, “আমেরিকা আমাদের রপ্তানি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বসিয়েছে, যা আমাদের রপ্তানি বাজারে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। তবে আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সেই হার কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা গেছে। আমি এজন্য এই সরকারকে ধন্যবাদ জানাই—তারা একটি বড় দায়িত্ব পালন করেছে।”
তবে একইসাথে তিনি আফসোস করে বলেন, “আমি আশা করেছিলাম এক বছরের মধ্যেই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তাদের পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। দুর্ভাগ্যবশত সেটি পুরোপুরি হয়নি, তবে তারা চেষ্টা করছেন।” তিনি জানান, সংস্কার কমিশনের বৈঠক ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে, এবং কয়েক দিনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশিত হবে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আশাবাদের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের প্রধান উপদেষ্টা কথা দিয়েছেন—আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে। দেশের মানুষও তাই চায়—একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হোক।” তিনি বলেন, “আমার এখন কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই—না কোনো এমপি আছেন, না কেউ সংসদে আমার সমস্যার কথা তুলবেন। এজন্যই দেশের জনগণের জন্য একটি কার্যকর পার্লামেন্ট অত্যাবশ্যক।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি গত বছরের উত্তাল উত্তরার কথা স্মরণ করে বলেন, “এই জায়গায় এক বছর আগে আমাদের সাহসী শিক্ষার্থীরা শহীদ হয়েছিলেন। তাদের পরিবারের কান্না এখনো থামেনি। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না—এই শপথ নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।”
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক এবং সঞ্চালনায় ছিলেন যুগ্ম আহ্বায়ক এবিএমএ আবদুর রাজ্জাক। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি, বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান, নির্বাহী সদস্য সাইফুল আলম নিরব, কৃষক দলের নেতা হাসান জাফির তুহিন, যুবদলের নুরুল ইসলাম নয়ন, স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজিব আহসান, মহিলা দলের সুলতানা আহমেদ, জাসাসের হেলাল খান, তাঁতী দলের আবুল কালাম আজাদ, মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব মোস্তফা জামান, এসএম জাহাঙ্গীরসহ শহীদদের পরিবারের সদস্যরা।
এই সমাবেশ একদিকে ছিল শোকের, অন্যদিকে প্রতিজ্ঞার—বাংলাদেশে আর যেন ফ্যাসিবাদ, দুঃশাসন ও একদলীয় শাসন ফিরে না আসে, সেই অঙ্গীকারেই উজ্জীবিত ছিলেন সবাই।










