সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে? করণীয়
- Update Time : ০৬:০৬:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫
- / ২০৩ Time View

সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা অনেক সময়েই অজান্তেই তাকে মা-বাবার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ছোটবেলায় যে সন্তান সারাক্ষণ মা-বাবার আঁচলে ঘুরত, সে-ই বয়ঃসন্ধিতে পা দিয়ে একা সময় কাটাতে শুরু করে, নিজের জগতে ডুবে যায়। অনেক সময় পরিবারে থেকেও সে একাকী হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবার দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়—“আমার সন্তান আমাকে আর আগের মতো কাছে টানে না।” এই দূরত্ব কিন্তু একদিনে তৈরি হয় না।
বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাগুলো বলছে, সন্তান-অভিভাবকের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর একটি হলো সময়ের অভাব এবং একমুখী শাসন বা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক Child Mind Institute জানায়, সন্তানদের সঙ্গে মানসিক বন্ধন গড়ে তুলতে হলে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলাই সবচেয়ে জরুরি (Child Mind Institute, 2021)।
তাই সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ঠ করতে কিছু সহজ কিন্তু ফলপ্রসূ কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। চলুন জেনে নেওয়া যাক—
১. ছোট ছোট সময়কেও মূল্য দিন: রুটিন মিলিয়ে সময় কাটান
আপনি হয়তো সারাদিন কর্মব্যস্ত। তবুও প্রতিদিনের ছোট ছোট সময়গুলো সন্তানকে দিন—তা হতে পারে সকালের নাশতা, স্কুলে পৌঁছে দেওয়া বা ঘুমাতে যাওয়ার আগের ১০ মিনিট। American Academy of Pediatrics বলছে, প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট একসঙ্গে সময় কাটানো শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে (AAP, 2020)।
সন্তানের রুটিন জানুন—সে কখন স্কুলে যায়, কোন ক্লাসে কেমন পারফর্ম করছে, কোন খেলাটা এখন তার পছন্দের—এসব তথ্য জানা ও তাতে আগ্রহ দেখানো সন্তানকে অনুভব করায় যে, আপনি তার জীবনে সত্যিকারের উপস্থিত।
২. মনোযোগী শ্রোতা হোন, বন্ধু হয়ে উঠুন
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তান তার নিজস্ব চিন্তা ও অনুভব তৈরি করতে শুরু করে। এই সময়ে অভিভাবকের আচরণ তার মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ বয়সে সন্তানেরা বেশি স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা চায়, তাই খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ না করে সহানুভূতির জায়গা থেকে তাকে বোঝার চেষ্টা করতে হয় (Steinberg, L. Adolescence,
আপনি যদি সন্তানের কথাগুলো আগ্রহ নিয়ে শোনেন—সে কী ভাবছে, কোন বিষয়ে উদ্বিগ্ন, কী খেতে ভালোবাসে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে—তাহলে সে নিজেই আপনাকে তার মনের কথা বলতে শুরু করবে। এই উন্মুক্ত যোগাযোগই সন্তানকে বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করে এবং একটি শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন তৈরি করে।
৩. সাপ্তাহিক স্পেশাল সময়: সন্তানের পছন্দকে গুরুত্ব দিন
সপ্তাহান্তে একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, বা বাসায় বসেই পছন্দের কোনো কাজ করা—এই সময়গুলো সন্তানকে একধরনের নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভব দেয়। Harvard University Center on the Developing Child এর মতে, সন্তান যখন দেখে তার পছন্দকে মা-বাবা গুরুত্ব দিচ্ছেন, তখন তার আত্মবিশ্বাস এবং পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয় (Harvard, 2022)।
সন্তান কোনো ভুল করলে কড়া গলায় না বলে তাকে বোঝান—”তুমি নিজেই ভেবে দেখো, এটা ঠিক হলো কিনা।” এতে তার ভাবনার ক্ষমতা বাড়বে, এবং সে আপনাকে বিচারকের বদলে অভিভাবক হিসেবে দেখবে। এমন অভিভাবকত্বই শিশুর মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক বিকাশের জন্য জরুরি।
আজকের জেনারেশন (জেন জি ও জেন আলফা) আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনমনা ও প্রযুক্তিনির্ভর। তারা যতটা না শাসন বোঝে, তার চেয়ে বেশি বোঝে যুক্তি ও সম্পর্কের মূল্য। তাই ওভারপ্রোটেক্টিভ না হয়ে তাদের জীবনে বন্ধুর মতো থেকে সঠিক পথনির্দেশ দিন।
সবসময় মনে রাখুন, সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে তাকে সময় দিতে হবে, শুনতে হবে, বুঝতে হবে। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশু বড় হয়, কিন্তু একটি অজেয় দূরত্ব তৈরি হলে সেটি কখনোই ঘোচানো যায় না।
সূত্র:
- Child Mind Institute. (2021). How to Build a Strong Parent-Child Relationship.
- American Academy of Pediatrics (2020). Parenting During the Pandemic.
- Steinberg, L. (2020). Adolescence. McGraw Hill Education.
- Harvard University Center on the Developing Child. (2022). The Science of Resilience.










