অন্তর্বর্তী সরকারের ‘এক্সিট পলিসি’ এখন সময়ের দাবি: ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
- Update Time : ০৫:৪৮:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫
- / ১৮৫ Time View

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, এখন সময় এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি ‘এক্সিট পলিসি’ অর্থাৎ নির্ধারিত বিদায় পথ নির্ধারণ করার। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বিদায় নেবেন ঠিকই, কিন্তু তারা যে কাজগুলো করে যাচ্ছেন, আগামী সরকার সেগুলো পুরোপুরি বৈধতা দেবে কি না, এই প্রশ্নটি এখনো সামনে রয়ে গেছে এবং রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।
আজ বুধবার রাজধানীর গুলশানে অনুষ্ঠিত ‘ডেমোক্রেসি ডায়াস বাংলাদেশ’ আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, কেন বারবার বাংলাদেশের মতো দেশে অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন, দুর্বল রাজনৈতিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনির্ভরযোগ্যতা এবং একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অভাবই সাধারণত এই প্রয়োজনীয়তার পেছনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে অতীতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অভিজ্ঞতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন—যার কিছু অভিজ্ঞতা সৌভাগ্যজনক, আবার কিছু দুর্ভাগ্যজনকও। তিনি বলেন, যখন কোনো রাজনৈতিক দল শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ রুদ্ধ করে ফেলে, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং তখনই জরুরি অবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়।
তিনি আরও বলেন, এই ভঙ্গুর অবস্থা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়। এরশাদ সরকারের শেষ দিকে এমন একটি সংকট তৈরি হয়েছিল, যার পরিণতি হিসেবে দেখা যায় ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান। সেখানে জনগণের ঐক্য ও চাপের ফলে একটি সামরিক শাসনের অবসান হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে।
তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায়ও আমরা এক ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। যদি ক্ষমতার হস্তান্তর নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য না থাকে, যদি জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত না হয়, তাহলে এমন অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে। তাই এখন থেকেই ভবিষ্যৎ অন্তর্বর্তী বা বিদায়ী সরকারের দায় ও দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা জরুরি—যা শুধু সংবিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটাবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার শুধু একটি সময়কাল পার করার গ্যারান্টার নয়, বরং তারা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে দেয়। সেজন্য তাদের কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের ধরন নিয়ে এখন থেকেই স্বচ্ছতা ও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এক্সিট পলিসি ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তার বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়ী করে বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করে ফেলা, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে অস্বীকার করা এবং নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বারবার হুমকির মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি বারবার ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণের মধ্যেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অনাস্থা জন্ম নেয়।
সেমিনারের উপসংহারে তিনি বলেন, শুধু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কারের সময় এসেছে। সব পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি না হলে, বাংলাদেশ গণতন্ত্রের দিক থেকে আরও পশ্চাদপসরণ করবে। তাই ‘এক্সিট পলিসি’ এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের দাবি।










