‘৩৬ জুলাই: মুক্তির উৎসব’ আয়োজন ঘিরে বিতর্ক, কনসার্ট করতে ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে ৭০ প্রতিষ্ঠানে রাবি’র সাবেক সমন্বয়কের চিঠি
- Update Time : ১০:১১:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫
- / ২০৮ Time View

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মারের উদ্যোগে আয়োজিত ‘৩৬ জুলাই: মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা। এ অনুষ্ঠানের জন্য ৭০টিরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও করপোরেট সংস্থার কাছে ৭৬ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান চেয়ে পাঠানো চিঠিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই বিতর্ক।
এমন একটি বিতর্কিত চিঠিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীবের ‘স্ট্রংলি রিকমেনডেড’ মন্তব্য এবং স্বাক্ষর রয়েছে, যা বিষয়টিকে আরও ঘনীভূত করেছে। জানা যায়, অনুদান চেয়ে পাঠানো চিঠিগুলোতে ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। কোনো কোনো চিঠির সঙ্গে যুক্ত ছিল বিশদ বাজেট পরিকল্পনা ও অনুষ্ঠানসূচি।

চিঠিতে বলা হয়, “৩৬ জুলাই” রাজশাহীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, যেটি ‘জুলাই আন্দোলন’ হিসেবে পরিচিত। এই আন্দোলনে বহু তরুণ শহীদ হন এবং অনেকে আহত হন গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। সেই ঘটনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘মুক্তির উৎসব’-এ শহীদ পরিবারের সদস্য, আহতদের পরিবার, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। মূল লক্ষ্য হলো—শহীদদের স্মরণ, তরুণ প্রজন্মকে আন্দোলনের ইতিহাস জানানো এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের গুরুত্ব উপলব্ধি করানো।
চিঠিতে সালাউদ্দিন আম্মারের পাশাপাশি স্বাক্ষর করেন কে এস কে হৃদয়, যিনি এই উৎসবের অন্যতম সংগঠক এবং ‘ক্যাম্পাস বাউলিয়ানার’ ডিরেক্টর ও কো-ফাউন্ডার। গত ৯ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পাঠানো প্রস্তাবনায় উপাচার্য অধ্যাপক নকীব লিখেছেন, “Strongly Recommended।” এরপর রাজশাহী সিটি করপোরেশন ২৩ জুলাই তাদের বরাদ্দ হিসেবে ২ লক্ষ টাকা অনুদানও দেয়।
তবে এই আর্থিক অনুদান প্রক্রিয়া নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এবং বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন সালাউদ্দিন আম্মার। এরপর তিনি ২৭ জুলাই নিজের ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে ‘ভয়াবহ মিডিয়া ট্রায়াল’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, “জুলাইয়ের পর চাইলে আমি কোটি কোটি টাকা ইনকাম করতে পারতাম। কিন্তু আমি বরং চেয়েছি শহীদদের স্মরণে একটি বিশাল আয়োজন করতে।”
তিনি আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রাথমিকভাবে একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রশাসন জানায় তাদের কাছে বাজেট নেই, তবে অন্যান্য সাহায্য দেওয়া হবে। এরপর উপাচার্যের সুপারিশপত্রসহ দেশের প্রায় ১৫টি ব্যাংকের হেড অফিসে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়, কিন্তু প্রায় সবগুলোই প্রত্যাখ্যান করেছে। কেবল ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১৫ হাজার টাকা, চেম্বার অব কমার্স ৩০ হাজার টাকা এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশন ২ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে।
পরবর্তীতে আরেকটি স্ট্যাটাসে সালাউদ্দিন বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত ১৯টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছি, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বড় অর্থসংস্থান হয়নি। আমি কথা দিচ্ছি, এই আয়োজন শেষে প্রতিটি টাকার হিসাব, বাজেট, আয়-ব্যয়ের ডকুমেন্টস প্রকাশ্যে আনবো।” তিনি জানান, গত বছর ফেনীর বন্যার কারণে ‘বিজয় উৎসব’ করা সম্ভব হয়নি। এবার সেই উৎসব রাজশাহীতে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, কারণ এই অঞ্চলের বিশেষ ভূমিকা ছিল জুলাই আন্দোলনে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নকীব সমালোচনার উত্তরে জানান, “আমি শুধু সালাউদ্দিন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন যখন কোনো কার্যক্রমের জন্য সাহায্য চায়, তখন তাদের অনুরোধে সুপারিশপত্র দিয়ে থাকি। এটি আমার দায়িত্বের অংশ।”
সামাজিক মাধ্যমে এই আয়োজন ও অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ বলছেন, শহীদদের স্মরণে একটি আয়োজনের পেছনে অর্থ জোগাড়ের এই প্রচেষ্টা যুক্তিসঙ্গত, আবার কেউ বলছেন এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ পদ্ধতি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক দেশের ছাত্র রাজনীতি, সামাজিক উদ্যোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সহায়তা কাঠামো নিয়ে একটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংগঠনের স্বচ্ছতা, উদ্দেশ্য এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলেই তারা মনে করছেন।










