“ব্যাংক খাত থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ৮০% অর্থ, পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৩৫ বিলিয়ন ডলার” —অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
- Update Time : ১০:০৮:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫
- / ২৭৫ Time View

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আজ চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি—এমনটাই মন্তব্য করেছেন সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বর্তমান সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “দেশে এখন ভালো কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যত অবশিষ্ট নেই। ব্যাংক খাতের ৮০ শতাংশ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে, যেটি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।” এ তথ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তিনি তুলে ধরেন।
শনিবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান রচিত ‘অর্থনীতি, শাসন ও ক্ষমতা: যাপিত জীবনের আলেখ্য’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রাতিষ্ঠানিক পতনের গভীর সংকেত
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমরা যে প্রক্রিয়াগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেগুলো ভেঙে গেছে। শুধু আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি, পুরো প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন সবাই বলছে নতুন করে শুরু করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—মানুষগুলো তো রয়েই গেছে। তাদের মানসিকতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকে পরামর্শ দেন—সব পুরনো বাদ দিয়ে দাও। কিন্তু সেটা বাস্তবসম্মত নয়। তাই এখন মাথায় হাত বুলিয়ে, আবার কখনো ধমক দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হচ্ছে।”
সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক সংস্কারের তাগিদ
সুশাসনের অভাবকেই তিনি সব সমস্যার মূল হিসেবে চিহ্নিত করেন। বলেন, “দেশে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য পর্যন্ত কারও ক্ষমতার উপর কোনো কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নেই। এখানে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কার না হলে, যত আর্থিক বা কাঠামোগত সংস্কারই করা হোক, তার সুফল আসবে না।”
ড. সালেহউদ্দিন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সংস্কারের আহ্বান জানান। বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোতেও কাঠামোগত গণতন্ত্র নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এককভাবে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে হওয়া উচিত নয়।”
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের
সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা তুলে ধরে সালেহউদ্দিন বলেন, “গত বছরের আগস্টে এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় এমন আর্থিক দুরবস্থা দেখা গেছে, যার নজির বিশ্বে বিরল। ব্যাংক খাত থেকেই ৮০ শতাংশ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে, যার প্রভাব এখন পুরো অর্থনীতিতে ভয়াবহভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “IMF তাদের প্রাথমিক হিসাবে বলেছিল, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে ১৮ বিলিয়ন ডলার লাগবে। কিন্তু সাম্প্রতিক আপডেট অনুযায়ী, এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এটা শুধু একটা সংখ্যা নয়, এর অর্থ হলো—অর্থনীতির ভিত্তিটাই এখন দুর্বল হয়ে গেছে।”
‘নতুন মানুষ নয়, নতুন মনোভাব দরকার’
তিনি বলেন, “মানুষ তো বদলায়নি, বদলেছে পরিস্থিতি। কিন্তু আমরা যদি মনোভাব না বদলাই, তাহলে পুনর্গঠনও হবে কাগজে-কলমে, বাস্তবে নয়। এখন প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সত্যিকারের জবাবদিহিতা।”
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারাও দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বইয়ের লেখক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “অর্থনীতি ও শাসনের এই অন্ধকার চক্র ভাঙতে হলে আমাদের আগে সত্যকে স্বীকার করতে হবে এবং তারপর সঠিক কৌশল নিয়ে এগোতে হবে।”
বর্তমান সময়ের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক খাতের বিপর্যয়। আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং সংস্কার ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য যেন সেই বাস্তবতারই নিঃসঙ্কোচ উচ্চারণ—যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সংস্কারের অভাব, ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা একসঙ্গে মিশে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।










