গত ১৫ বছরে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে গণতন্ত্র: মির্জা ফখরুল
- Update Time : ০২:৫৮:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫
- / ২০৬ Time View

গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশে একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে—এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। সভার মূল প্রতিপাদ্য ছিল—“গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও বর্তমান সংকট: উত্তরণের পথ।” এতে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও অংশ নেন।
গণতন্ত্রের অবক্ষয় ও জবাবদিহিতার সংকট
বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, “গত ১৫ বছরে যে কৌশলে সরকার দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, তা নজিরবিহীন। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন—সব জায়গায় আজ দলীয়করণ প্রকট। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার বদলে এখন জনপ্রতিনিধিরা হয়ে উঠেছে ক্ষমতার চাকর।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সময়কালে দেশে জবাবদিহিতার চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই ঘাটতির সুযোগ নিয়েই দেশে চালানো হয়েছে ভয়াবহ লুটপাট, যার প্রভাব অর্থনীতির সর্বস্তরে বিদ্যমান। সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “জবাবদিহিতা না থাকলেই দুর্নীতির মহোৎসব হয়, আর আজ আমরা সেটারই শিকার।”
নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি
বিএনপি মহাসচিব বলেন, “দেশের রাজনৈতিক সংকটের একমাত্র সমাধান গণতান্ত্রিক নির্বাচন। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই রাজনীতিতে ভারসাম্য ফিরে আসবে।” তিনি বলেন, বিএনপি বরাবরই নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “সরকারি দল ও প্রশাসনের সহায়তায় আজকের সংসদ নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়। এর বদলে দরকার এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সকল দলের সমান অংশগ্রহণ এবং প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকবে।”
রাজনৈতিক সংস্কার ও পিআর পদ্ধতি নিয়ে অবস্থান
রাষ্ট্রের বর্তমান কাঠামো এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন ফখরুল। তার মতে, “এটি একদিনে সম্ভব নয়। এজন্য সময়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দরকার।”
এ সময় তিনি ‘প্রোপরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR)’ বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নিয়ে নিজের দ্বিমত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এ দেশের সাধারণ মানুষ চায় এমন একজন নেতা, যাকে তারা চেনেন, বিশ্বাস করেন, এবং যিনি তাদের পাশে থাকবেন। কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে সেই ব্যক্তিগত যোগসূত্র থাকে না, ফলে জনসম্পৃক্ততা কমে যায়।” তিনি আরও বলেন, “এটা হয়তো কিছু দেশে কার্যকর, কিন্তু বাংলাদেশের মতো আবেগপ্রবণ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পদ্ধতির উপযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ।”
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক শঙ্কা
আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে এসে মির্জা ফখরুল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্পর্ক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা এবং তার সম্ভাব্য শুল্কনীতি (tariff policy) বাংলাদেশের রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
“আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প মূলত মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ট্রাম্প যদি আগের মতো শুল্ক আরোপ করেন, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে,”—বলেন ফখরুল।
সংলাপ ও প্রস্তুতির আহ্বান
বিএনপি মহাসচিব বলেন, “এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। রাজনৈতিক বিভক্তি না কমিয়ে বরং বৃহত্তর সংলাপের মাধ্যমে আমরা একটি কার্যকর ভবিষ্যতের পথ খুঁজে পেতে পারি।” তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে খোলামেলা আলোচনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি নিয়ে গভীর গবেষণা ও কৌশলগত প্রস্তুতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শেষে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আজ যে অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে—স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।”
মির্জা ফখরুলের বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির এই ত্রিমাত্রিক সংকটে একটি বাস্তবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিকল্পিত রাষ্ট্র সংস্কার এখন সময়ের দাবি।










