হঠাৎ কেন ইউনেসকো থেকে বেরিয়ে গেল আমেরিকা?
- Update Time : ১২:৩২:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
- / ১৩৪ Time View

২৩ জুলাই ২০২৫, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো থেকে আবারও সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, সংস্থাটিতে চীনের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে এবং ইউনেস্কো ইসরায়েলবিরোধী পক্ষপাতমূলক অবস্থান নিচ্ছে—এই দুইটি মূল কারণেই তারা এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
পুরনো নাটকের পুনরাবৃত্তি
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি প্রথমবার নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে (২০১৭ সাল) ইউনেস্কো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছিলেন। সে সময়ও একই অভিযোগ ছিল—ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাতহীনতা এবং সংস্থাটির “অসঙ্গত আচরণ”। পরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে ২০২৩ সালে ইউনেস্কোতে যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় যুক্ত করেন। কিন্তু ২০২৫ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে আবারও একই সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করলেন।
মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, “ইউনেস্কোতে আমাদের সদস্যপদ থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংস্থাটি এক ধরনের বিভেদমূলক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া এবং আমাদের অগ্রাধিকারের সঙ্গে অসঙ্গত কর্মকাণ্ডের কারণেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন কোনো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে থাকতে চাই না, যেখানে আমাদের কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পায় না, আর আমাদের মিত্র রাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করা হয়।”
ইউনেস্কোর প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছে ইউনেস্কো। সংস্থাটির মহাপরিচালক অদ্রে এজুলে বলেন, “এটি শুধু ইউনেস্কোর জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি দুঃখজনক মুহূর্ত। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বৃহৎ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্ত বহুপাক্ষিকতার মৌলিক চেতনার বিরোধী।”
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এই ঘোষণায় ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক সহযোগিতা ও জ্ঞানের বিনিময়ের পথ সংকুচিত করবে।”
সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কবে?
রয়টার্স জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে। এর মানে আগামী দেড় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইউনেস্কোর সদস্য হিসেবে থাকলেও, নতুন কোনো পরিকল্পনা, তহবিল বা কর্মকাণ্ডে তারা অংশ নেবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনীতির পেছনে ভূরাজনীতি
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধুই সাংস্কৃতিক বা নীতিগত দ্বন্দ্ব নয়—আছে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। বিগত কয়েক বছরে ইউনেস্কোর কার্যক্রমে চীনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তহবিল জোগান বৃদ্ধি পেয়েছে। সেইসঙ্গে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক নিদর্শনকে “প্যালেস্টিনিয়ান হেরিটেজ” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় মার্কিন প্রশাসন বরাবরই ক্ষুব্ধ ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক সময় এই সিদ্ধান্ত নিলো যখন বিশ্বব্যাপী মতবিভক্তি, গঠনমূলক সংলাপ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যৎ কী?
এখন প্রশ্ন উঠছে—এই সিদ্ধান্ত কি শুধুই ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন? যদি আগামী নির্বাচনগুলোতে প্রশাসনের পরিবর্তন হয়, তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইউনেস্কোতে ফিরে আসবে? নাকি এটি হয়ে দাঁড়াবে বৈশ্বিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একঘরে হওয়ার সূচনা?
বিশ্বজুড়ে শিক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং সংস্কৃতি বিনিময়ের ক্ষেত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে একটি শূন্যতা তৈরি করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনেস্কো ত্যাগের সিদ্ধান্ত আবারও বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার ওপর একটি গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিলো। ভবিষ্যতে কীভাবে এই ফাঁক পূরণ হবে, এবং ইউনেস্কো অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবে, তা দেখার বিষয়। তবে এটুকু নিশ্চিত—এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।










