ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর মরিচের গুঁড়া ছুড়ে মানবিক বিপর্যয় বাড়াল ইসরায়েলি সেনারা
- Update Time : ১১:৫২:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ জুলাই ২০২৫
- / ১২৪ Time View

গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফা শহরের শাকুশ এলাকায় অবস্থিত বিতর্কিত ত্রাণ সংস্থা জিএইচএফ পরিচালিত একটি ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে জড়ো হওয়া অসহায় ও ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর মরিচের গুঁড়া ছুড়েছে ইসরায়েলি সেনারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২০ সেকেন্ডের এক ভিডিওতে এই অমানবিক দৃশ্য ধরা পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনজন সশস্ত্র ইসরায়েলি সেনা মরিচের গুঁড়ার স্প্রে ব্যবহার করে নারী, শিশু ও পুরুষদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করছেন। ভিডিওটি ১০ জুলাই মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয় এবং তা শনিবার রাতে অনলাইনে প্রকাশিত হলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
আল–জাজিরার ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট ‘সানাদ’ ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করে নিশ্চিত করে যে ঘটনাটি রাফার শাকুশ এলাকায় ঘটেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, আতঙ্কিত মানুষজন চারদিকে দৌড়ে পালাচ্ছেন—কারও মুখ ঢাকা কাপড়ে, কেউ আবার ময়দার বস্তা পিঠে নিয়ে প্রাণভয়ে ছুটছেন। এই ত্রাণকেন্দ্রগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত জিএইচএফ পরিচালনা করছে, যারা কার্যত জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন বৃহৎ ত্রাণ সরবরাহ ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে আলাদা বিতরণ কার্যক্রম চালাচ্ছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত মে মাসের শেষ দিকে জিএইচএফ গাজায় কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮৯১ জন ফিলিস্তিনি খাবারের খোঁজে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৬৭৪ জনই নিহত হয়েছেন জিএইচএফের ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোর আশপাশে। এসব মৃত্যুর পেছনে রয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অতর্কিত গুলি, মরিচের গুঁড়ার স্প্রে, বোমা বর্ষণ ও অন্যসব সহিংস আচরণ। গত রোববারই গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ৮৪ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭৩ জন ছিলেন ত্রাণ সংগ্রহে জড়ো হওয়া সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহমুদ মোকাইমার গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি ত্রাণের আশায় জিএইচএফের কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলেন, তখনই ইসরায়েলি সেনারা প্রথমে সতর্কতামূলক গুলি চালায়, পরে সরাসরি গুলি করে। তিনি বলেন, “দখলদার বাহিনী আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছে। আমি অন্তত তিনজনকে মাটিতে নিথর পড়ে থাকতে দেখেছি এবং বহু আহত মানুষকে রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড়াতে দেখেছি।”
এই মুহূর্তে গাজার শিশুরা সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। গত রোববার গাজা নগরীর আল-আকসা মার্টায়ার হাসপাতালে চার বছর বয়সী রাজান আবু জাহের অপুষ্টি ও অনাহারে মারা যায়। শনিবার আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক জানান, সেখানে দুজন ফিলিস্তিনি, যার মধ্যে ৩৫ দিনের এক নবজাতকও রয়েছে, অনাহারে প্রাণ হারিয়েছে। গাজার অনেক জায়গায় শিশুরা না খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
আল–জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খোদারি বলেন, “গাজার মা-বাবারা জানেন, জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রে গেলে গুলিতে মারা পড়তে পারেন, তবুও তাঁরা যান। কারণ, না গেলে তাঁদের সন্তানদের না খেয়ে থাকতে হয়। বাজারে কিছু কেনার মতো অবস্থা নেই। সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া।” তিনি আরও বলেন, “ইসরায়েল যদি গাজায় খাদ্য প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়, তবে ফিলিস্তিনিদের সামনে খাবারের জন্য জীবন ঝুঁকিতে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।”
এই মানবিক বিপর্যয় দিনে দিনে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সমাজের একটি বড় অংশ এখনও নিষ্ক্রিয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং জাতিসংঘের কয়েকটি শাখা এই পরিস্থিতিকে “মানবতাবিরোধী অপরাধ” বললেও কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। খাবারের জন্য মরিচের গুঁড়া সহ্য করতে হচ্ছে যাদের, তাদের কান্নার আওয়াজ আজও পৃথিবীর সবচেয়ে নীরবতম দেয়ালগুলোকেও নাড়া দিচ্ছে না।
মানবতা আজ গাজার মরুভূমিতে মরিচের ধোঁয়ার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে।










