ফজরেই জনসমুদ্রে রূপ নেয় জামায়াতের সমাবেশস্থল, অনন্য শৃঙ্খলায় দেশজুড়ে প্রশংসা
- Update Time : ১১:১৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫
- / ১৬৭ Time View

রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেন শনিবার (১৯ জুলাই) ভোরেই পরিণত হয় একটি বিশাল জনসমুদ্রে। সাত দফা দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত জাতীয় মহাসমাবেশ শুরু হওয়ার কথা দুপুর ২টায়, তবে তার বহু আগেই—ফজরের নামাজের পরপরই—পুরো সমাবেশস্থল পূর্ণ হয়ে ওঠে হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে। শুক্রবার রাত থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা দলীয় কর্মীরা অবস্থান নিতে শুরু করেন উদ্যানের চারপাশে।
সকাল ১০টা থেকে সমাবেশমঞ্চে পরিবেশিত হয় ইসলামি সংগীত—দেশের খ্যাতনামা ইসলামি সংগীতশিল্পীদের পরিবেশনায় যেন এক ভিন্নমাত্রা পায় পুরো আয়োজন। সুশৃঙ্খলভাবে বসে সংগীত উপভোগ করেন হাজারো কর্মী, যাঁদের চোখেমুখে ছিল প্রত্যয়ের দীপ্তি ও নিরবিচার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
আদর্শিক শৃঙ্খলা: লঞ্চভ্রমণেও ধর্মীয় ও নৈতিক শুচিতা
ঝালকাঠি থেকে আগত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন,
“আমাদের জেলা থেকে হাজারো নেতাকর্মী লঞ্চে এসেছেন। বাড়ি থেকে নির্দেশনা অনুযায়ী খাবার এনেছেন। কোনো হৈ-চৈ নেই, কোনো অশালীনতা নেই। সিগারেট বা নেশাদ্রব্যের গন্ধ পর্যন্ত মেলেনি। কেউ কারও উপর বোঝা হয়ে আসেনি। বরং একে অপরের ঘুমের সুযোগ দিয়েছেন। এমন শৃঙ্খলা কেবল আদর্শিক সংগঠনেই দেখা যায়।”
তিনি বলেন, নিজ নিজ খরচে প্রত্যেকে অংশগ্রহণ করেছেন, সংগঠন থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা ছাড়াই। এই ত্যাগ ও নৈতিকতা বর্তমান রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
আত্মনিয়ন্ত্রণে প্রতিটি আগমন
কুমিল্লা থেকে আগত আবির রহমান বলেন,
“আমরা গতরাতেই রওয়ানা করি এবং ফজরের আগেই পৌঁছে যাই। আমাদের ব্যাগে শুকনো খাবার, পানি ও জায়নামাজ ছিল। কেউ চিৎকার করে কিছু চাইছে না, সবাই যার যার দায়িত্বে অটল। অনেকেই স্বেচ্ছায় অন্যদের খরচও বহন করছেন।”
পঞ্চগড় থেকে আগত কাউসার ইসলাম জানান,
“আমরা বিকেলেই রওয়ানা করি, নির্দেশনা ছিল ফজরের নামাজের পর মাঠে প্রবেশ করতে। সেই অনুযায়ী নির্দিষ্ট গাড়িতে এসেছি, শৃঙ্খলাভাবে মাঠে এসেছি।”
সমাবেশের প্রস্তুতি: আয়োজনেও সৌন্দর্য
মহাসমাবেশে সভাপতিত্ব করছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এতে পিআর ভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, বিচার বিভাগীয় সংস্কার, রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি উপস্থাপন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে দেশের সব রাজনৈতিক দলকে উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে জামায়াতের পক্ষ থেকে।
সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ওজু ও নামাজের স্থান, মেডিকেল বুথ, শৌচাগার ও পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা। প্রায় ৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করছেন প্রবেশপথ, নিরাপত্তা, মাঠের শৃঙ্খলা এবং জরুরি সেবার কাজে। নিরাপত্তা বিষয়ে জামায়াত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আগেই আলোচনা করেছে।
পর্যালোচনা ও তাৎপর্য
রাজধানীর বুকে এমন শৃঙ্খলিত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চেতনায় উদ্দীপ্ত একটি সমাবেশ ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে নজিরবিহীন। অংশগ্রহণকারীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ নিয়মানুবর্তিতা এবং জনসম্পৃক্ত বার্তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়—জামায়াত একটি আদর্শিক ও গণভিত্তিক রাজনীতি চর্চায় দৃঢ়।
এই মহাসমাবেশ কেবল রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং সামাজিক শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও জনগণের সঙ্গে সংগঠনের সংযোগ কতটা গভীর হতে পারে, তারও একটি প্রকাশ। শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার এ উদাহরণ দেশে রাজনীতির নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।











