সেক্সটর্শন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: ভয়াবহ ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের নতুন রূপ
- Update Time : ১২:৪৯:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই ২০২৫
- / ১৮৪ Time View

এএফপি’র বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভয়াবহ ডিজিটাল অপরাধ ‘সেক্সটর্শন’-এর বিস্তার এখন বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকির এক কিশোর আত্মহত্যা করার পর বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। জানা গেছে, ওই কিশোরকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল একটি এআই-জেনারেটেড নগ্ন ছবি ব্যবহার করে। চক্রটি তার কাছ থেকে ৩ হাজার ডলার আদায়ের চেষ্টা করছিল।
এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি বড় ধরনের সমস্যার প্রতিফলন। বর্তমান প্রযুক্তি যুগে, এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে বাস্তবসম্মত নগ্ন ছবি এবং ভিডিও, যেগুলো ব্যবহার করে কিশোর-কিশোরীদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে সংগঠিত সাইবার চক্র।
কী এই ‘সেক্সটর্শন’?
‘সেক্সটর্শন’ শব্দটি এসেছে “সেক্সুয়াল এক্সটর্শন” থেকে। এটি এক ধরনের ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল, যেখানে কাউকে ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি/ভিডিওর ভয় দেখিয়ে অর্থ কিংবা অন্য সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়। বর্তমানে এটি ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে—বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মাঝে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের টার্গেট করে, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের কাল্পনিক নগ্ন ছবি তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল করছে অপরাধীরা।
বাস্তব অভিজ্ঞতা: একটি বাবা’র কান্না
আত্মহত্যাকৃত কিশোরের বাবা জন বারনেট মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজকে বলেন, “যারা আমাদের সন্তানদের টার্গেট করছে, তারা সংগঠিত, নিষ্ঠুর এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। তারা বাস্তব ছবি ব্যবহার করে না—তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যা খুশি তৈরি করে এবং তা দিয়েই ব্ল্যাকমেইল করে।”
ব্ল্যাকমেইলের পেছনে প্রযুক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই জানায়, বিশেষ করে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলেরা এখন এই অপরাধের বড় শিকার। এতে আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব চক্র ব্যবহার করছে ‘নুডিফাই’ নামক অ্যাপ, যা যে কারো ছবি থেকে জামাকাপড় মুছে দিয়ে ডিজিটালি নগ্ন ছবি তৈরি করতে পারে। আগে এসব টুল শুধু সেলিব্রিটিদের জন্য ব্যবহৃত হতো। এখন সাধারণ স্কুল ও কলেজ পড়ুয়াদেরকেও টার্গেট করা হচ্ছে।
ব্রিটেনের ‘ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন (IWF)’ জানিয়েছে, এখন বাস্তব ছবি প্রয়োজন পড়ে না। জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে এমন ভয়াবহ ছবি বানানো সম্ভব যা বাস্তবের মতোই দেখায় এবং সেগুলো দিয়েই শিশুদের ব্ল্যাকমেইল করা হয়। তারা এমন একটি ‘পেডোফাইল গাইড’ খুঁজে পেয়েছে, যেখানে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কীভাবে ‘নুডিফাই’ টুল ব্যবহার করে কিশোরীদের ব্ল্যাকমেইল করা যায়।
এই অপরাধের অর্থনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিকেইটর-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে অন্তত ৮৫টি সক্রিয় নুডিফাই সাইট রয়েছে, যাদের বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ৩৬ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা)। মাত্র ছয় মাসে এই সাইটগুলোর মধ্যে ১৮টি সাইট ২.৬ মিলিয়ন থেকে ১৮.৪ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এসব সাইটের অনেকগুলোই গুগল, অ্যামাজন এবং ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রযুক্তিগত সেবা ব্যবহার করে চালু রয়েছে।
ইন্ডিকেইটর এই সাইটগুলোকে বর্ণনা করেছে “হ্যাক–এ–মোল গেম”-এর মতো। মানে একটি সাইট বন্ধ করলেই অন্যটি চালু হয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে:
- যুক্তরাজ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি যৌনচিত্রকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
- যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মে মাসে ‘টেক ইট ডাউন অ্যাক্ট’ নামক একটি দ্বিদলীয় বিল স্বাক্ষর করেছেন। এতে কারো অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত ছবি তৈরি বা প্রচার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং দ্রুত অনলাইন থেকে তা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ রয়েছে।
- মেটা (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) হংকংভিত্তিক একটি ‘নুডিফাই’ অ্যাপ ক্রাশ এআই-এর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। কারণ এটি মেটার নিয়ম ভেঙে বারবার তাদের প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিল।
- স্পেনে, একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ৫ জন তরুণের মধ্যে ১ জন ডিপফেক নগ্ন ছবির শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতেই একটি স্কুলে তিন কিশোর সহপাঠী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এআই দিয়ে তৈরি পর্নোগ্রাফি ছড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার শিশু ও কিশোরদের জন্য এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হয়েছে। যেমন প্রযুক্তির উন্নয়ন সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, তেমনি তা অপরাধীদের হাতে এক ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
সমাধান কী?
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন:
- কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি ও প্রয়োগ,
- এআই–চালিত কনটেন্ট শনাক্তকারী প্রযুক্তির উন্নয়ন,
- অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি,
- টেক কোম্পানিগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ ও তদারকি বৃদ্ধি,
এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যেকোনো প্রযুক্তির যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি নেতিবাচক দিকও বিদ্যমান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলেছে, কিন্তু এর অপব্যবহার যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে—সেটা আজকের শিশু-কিশোরদের ভুক্তভোগী করে সামনে এনেছে। সময় এসেছে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিতভাবে এই অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। না হলে এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে আমাদের সন্তানদের জীবন।










