গণহত্যার ছায়ায় গাজা: ৫৮ হাজারের বেশি নিহত, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ
- Update Time : ০৭:৩১:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
- / ১৪৪ Time View

গাজায় ইসরায়েলের লাগাতার সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে, এবং এর ভয়াবহতা প্রতিনিয়ত নতুন মাত্রা নিচ্ছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, এই যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ৫৮ হাজার ২৬ জনে পৌঁছেছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু। রবিবার ভোর থেকে নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১০০ জন ফিলিস্তিনি।
গাজা সিটির এক ব্যস্ত বাজারে চালানো বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক, ডা. আহমাদ কান্দিল। যুদ্ধকালীন অবস্থায় অসংখ্য মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া এই মানবদরদী চিকিৎসকের মৃত্যুতে গাজার জনগণ শোকাহত।
লক্ষ্যবস্তু সাধারণ মানুষ ও ত্রাণকেন্দ্র
গাজা সরকারের মিডিয়া অফিস এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলি বাহিনী নিয়মিতভাবে বেসামরিক নাগরিক ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (GHF)-এর ত্রাণকেন্দ্রগুলোকে তারা বর্ণনা করেছে “মৃত্যুকূপ” হিসেবে।
ঘোষণায় বলা হয়, “গাজায় যা ঘটছে তা নিছক যুদ্ধ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সংগঠিত গণহত্যার প্রকৌশল।” মানবিক সহায়তা গ্রহণ করতে গিয়ে এখনও পর্যন্ত কমপক্ষে ৮০৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৫,২৫০ জনের বেশি।
শিশুদের উপর হামলা
সবচেয়ে মর্মান্তিক হামলাগুলোর একটি সংঘটিত হয়েছে নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে। সেখানে এক পানির লাইনের পাশে ত্রাণের আশায় দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১০ জন নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই শিশু। আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন। আল-আওদা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আহমেদ আবু সাইফান জানান, এই হামলাটি ছিল সম্পূর্ণভাবে ‘নির্বিচার ও অমানবিক’।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা এক যোদ্ধাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল, তবে কারিগরি ত্রুটির কারণে ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে এই বক্তব্যের নিরপেক্ষ সত্যতা এখনও যাচাই হয়নি।
মানবিক বিপর্যয় ও জ্বালানির সংকট
যুদ্ধের পাশাপাশি গাজায় জ্বালানির ঘাটতির ফলে মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। অনেক পানিশোধনাগার ও ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি সংকট চরমে পৌঁছেছে। মানুষকে দীর্ঘ পথ হেঁটে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP), ও UNRWA সহ মোট আটটি সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে গাজায় জ্বালানি প্রবেশ না করালে জীবন রক্ষাকারী কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “এই জ্বালানির অভাবে প্রায় ২১ লাখ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে। আমাদের এখনই, পর্যাপ্ত এবং নিরাপদ জ্বালানির প্রবেশাধিকার প্রয়োজন।”
সহিংসতার মুখে দুর্বল কূটনীতি
যদিও যুদ্ধ থামাতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত আছে, তবু আশার আলো ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ রবিবার জানান, তিনি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আশাবাদী। কিন্তু কাতারে অনুষ্ঠিত আলোচনায় এখনো পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থেকেই যাচ্ছে।
ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের ডেপুটি নেতা মোহাম্মদ আল-হিন্দি আল-জাজিরাকে বলেন, “আমরা এমন একটি কাঠামোগত চুক্তির আলোচনায় আছি, যার তিনটি মূল ভিত্তি—আগ্রাসন থামানো, সেনা প্রত্যাহার এবং নিরাপদ ত্রাণ বিতরণ। কিন্তু ইসরায়েল এই তিন মূল বিষয়ে প্রতিশ্রুতি না দিয়ে কেবল বন্দি বিনিময় ইস্যুতে কথা বলছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা কোনো আত্মসমর্পণমূলক চুক্তি স্বাক্ষর করব না।”
অভ্যন্তরীণ সংকট ও রাজনৈতিক চাপ
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সংকটও আরও গভীর হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা জোনাতান উরিচের বিরুদ্ধে গোপন সামরিক তথ্য ফাঁসের অভিযোগে মামলা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জানা যায়, গত আগস্টে গাজায় ছয় ইসরায়েলি বন্দির মৃত্যুর বিষয়ে ‘বিল্ড’ নামের একটি জার্মান পত্রিকায় গোপন তথ্য ফাঁস হয়েছিল, যা উরিচ ও তার এক সহকারীর মাধ্যমে হয়েছে বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় দেশের ভেতরে নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
নেতানিয়াহু অবশ্য এই তদন্তকে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন, আর উরিচ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যদিও ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনের ভাষা নেতানিয়াহুর পূর্বঘোষিত অবস্থানের সঙ্গেই মিলে গেছে—যেখানে হামাসকে যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভঙ্গের জন্য দায়ী করা হয়।
অতীতের ব্যর্থ যুদ্ধবিরতি
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুই মাসের এক যুদ্ধবিরতির সময় ৩৮ জন বন্দি মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু সেই অস্থায়ী বিরতির পরপরই ইসরায়েল নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করে, এবং তা আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এই বাস্তবতায় ফিলিস্তিনিরা এখন যুদ্ধ নয়, বেঁচে থাকার লড়াই লড়ছেন। খাবার, পানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের জন্য তাদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, “উত্তর গাজা থেকে রাফা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিমি পথ হেঁটে মানুষ একটিমাত্র ত্রাণের প্যাকেট সংগ্রহের জন্য যাচ্ছেন। কিন্তু এমনকি সেখানেও তারা ইসরায়েলি গুলির মুখে পড়ছেন।”
গাজার এই মানবিক বিপর্যয় শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, গোটা বিশ্বের বিবেকের জন্যই এক নির্মম পরীক্ষা। শিশু, নারী ও নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চলমান নিষ্ঠুরতা ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে এখনই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দৃঢ় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। যুদ্ধবিরতির আশা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি এবং আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা সেই আশাকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে তুলছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো, প্রাণরক্ষা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা—তারপর রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়া।
সূত্র: আল জাজিরা, WHO, UNICEF, GHF, UNRWA










