‘মানব কসাইখানা’ গাজায় পরিণত হচ্ছে ‘মৃত্যুকূপে’, আরও ১১০ ফিলিস্তিনি নিহত
- Update Time : ০৩:২০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুলাই ২০২৫
- / ২২১ Time View

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর নির্মম হামলায় শনিবার আরও অন্তত ১১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৪ জন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত মানবিক সহায়তা সংস্থা ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ (GHF)-এর রাফায় অবস্থিত একটি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের সামনে খাবারের অপেক্ষায় থাকা সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একে অভিহিত করছে ‘মানব কসাইখানা’ ও ‘মৃত্যুকূপ’ হিসেবে। এদিকে, কাতারে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় এখনও অগ্রগতি নেই। বরং গাজাবাসীকে জোরপূর্বক স্থানান্তরের ইসরাইলি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় উঠছে।
খাবারের জন্য জড়ো হওয়া মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাফার আল-শাকুশ এলাকায় অবস্থিত জিএইচএফ-এর খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষারত ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ইসরাইলি সেনারা গুলি চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী সামির শাআত বলেন, “যে ব্যাগে খাবার থাকার কথা ছিল, সেটাই এখন মৃতদেহের কাফনের কাপড় হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম, এটা শুধুই মৃত্যুফাঁদ। ওরা উন্মাদের মতো গুলি চালিয়েছে।“ খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে মৃত বন্ধুর পাশেই দাঁড়িয়ে তিনি এই কথা বলেন।
আরেক বেঁচে যাওয়া মোহাম্মদ বারবাখ বলেন, “ওরা আমাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে খাবার নিতে ডাকে, ব্যাগ ধরিয়ে দেয়, তারপর হাঁস–মুরগির মতো গুলি করে।“
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ ও চিকিৎসা সংকট
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, মে মাসের শেষ থেকে গাজায় খাদ্য সহায়তা কেন্দ্রে চালানো হামলায় অন্তত ৮০০ জন নিহত এবং ৫,০০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। আল-আকসা হাসপাতালের মুখপাত্র খালিল আল-দেগরান জানিয়েছেন, বেশিরভাগ হতাহতদের মাথা ও পায়ে গুলি করা হয়েছে। তিনি জানান, এই বিশালসংখ্যক আহত ও নিহতের ঘটনায় হাসপাতালগুলো চরম সংকটে পড়েছে; প্রয়োজনীয় ওষুধ, অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম ও চিকিৎসা সামগ্রীর সঙ্কট দিন দিন গভীর হচ্ছে।
আরও বিস্তৃত হামলা ও ভয়াবহতা
শনিবার গাজা শহরের তুফাহ এলাকায় একটি বাড়িতে চালানো বোমা হামলায় মারা গেছেন ১৪ জন, যার মধ্যে ৪ জন জাফা স্ট্রিটের একটি বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এছাড়া জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে দুটি ভবনে হামলায় ১৫ জন নিহত হন এবং গাজা শহরের পশ্চিমে শাতি শরণার্থী শিবিরে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। উত্তর গাজার বেইত হানুন এলাকায় একযোগে ৫০টির বেশি বোমা ফেলা হয়। গত ৪৮ ঘণ্টায় গাজায় ইসরাইলি বাহিনী ২৫০ বার হামলা চালিয়েছে বলে জানায় গাজা মিডিয়া অফিস।
দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে গাজাবাসী, শিশু মৃত্যুর মিছিল
খাদ্য ও ওষুধ প্রবেশে বাধা দেওয়ায় ইতোমধ্যে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে গাজায়। গাজা মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, অপুষ্টিতে আরও ৬৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী ৬.৫ লক্ষ শিশু তাৎক্ষণিক অপুষ্টির চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, “গত তিন দিনে খাদ্য ও ওষুধের অভাবে আমরা বহু মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করেছি। এটি একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।”
যুদ্ধবিরতি আলোচনা আবারও ভেঙে পড়েছে
রয়টার্স ও এএফপির তথ্য অনুযায়ী, হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনা আবারও ভেঙে পড়েছে। মূল বিরোধ তৈরি হয়েছে গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর কতটুকু এলাকা ছাড়বে—তা নিয়ে। ফিলিস্তিনি সূত্র জানায়, ইসরাইল যে মানচিত্র উপস্থাপন করেছে, তাতে গাজার প্রায় ৪০ শতাংশ অঞ্চল, বিশেষ করে রাফাহ ও উত্তর-পূর্ব গাজা, ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। হামাস এই মানচিত্র প্রত্যাখ্যান করেছে এবং মার্চের আগের যুদ্ধবিরতির সীমায় ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়েছে।
হামাসের আশঙ্কা, রাফাহ সীমান্তের কাছে ছোট একটি এলাকায় লক্ষাধিক গাজাবাসী উদ্বাস্তুকে জোর করে স্থানান্তর করা হবে—যা এক ধরনের ‘জাতিগত নির্মূল’ ও ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ উদাহরণ’ হয়ে দাঁড়াবে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও নিন্দা
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো, জাতিসংঘ, ও মুসলিম বিশ্ব গাজায় ইসরাইলের এই বর্বর আগ্রাসন ও মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলছে, ইসরাইল শুধু সামরিক হামলাই চালাচ্ছে না, বরং সম্পূর্ণ একটি জনপদের জীবনযাপন ধ্বংসের পাঁয়তারা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজা এখন কেবল একটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়—এটি একটি সুসংগঠিত, পরিকল্পিতভাবে নির্মিত ‘মৃত্যুকূপ’, যেখানে মানবতা হারিয়ে গেছে; খাদ্য, ওষুধ, আশ্রয়—সবকিছুই পরিণত হয়েছে অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে।
বিশ্ব বিবেক কি এই নীরবতার দায় নেবে?
গাজা থেকে প্রতিদিন ভেসে আসছে আহাজারি, রক্তাক্ত শিশু, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন উঠেছে—এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে আর কতটা সময় লাগবে? মানবতা কি হার মানবে রাজনীতির কাছে?










