সাগর-রুনি হত্যা মামলা: ১১৯ বার পিছলো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ
- Update Time : ০৩:১৬:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ জুলাই ২০২৫
- / ১৭৪ Time View

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন আবারো পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ, আগামী ১১ আগস্ট নতুন দিন ধার্য করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ মোট ১১৯ বার পেছালো, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক দৃষ্টান্তমূলক দেরির উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৮ জুলাই (মঙ্গলবার) মামলাটির শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মিনহাজুর রহমান নতুন দিন নির্ধারণ করেন। এদিন ছিল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ। কিন্তু পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় আদালত পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেন।
হত্যাকাণ্ড ও তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাটে নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ রিপোর্টার মেহেরুন রুনি। তাদের মাত্র সাড়ে চার বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ বাসায় থাকলেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও অধরা রয়ে গেছে। হত্যার দিন সকালে রুনির ভাই নওশের আলম রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার শুরুতে তদন্ত করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। পরে তদন্তভার যায় ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)-এর হাতে। তবে ডিবি মাত্র ৬২ দিন পর ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে। এরপর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-কে। র্যাব দীর্ঘ ১২ বছর তদন্ত করলেও কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়।
এই প্রেক্ষাপটে, ২০২3 সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, হাইকোর্ট র্যাবকে তদন্ত কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেয়। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলাম এর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এক নির্দেশনায় বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ব্যর্থতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করে তদন্ত চালাতে হবে।
টাস্কফোর্স
উক্ত হাইকোর্ট আদেশের ভিত্তিতে গত ২৩ অক্টোবর সরকার চার সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন পিবিআই প্রধান। যদিও তদন্ত সংস্থা বদলানো হয়েছে এবং টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, তবে গত এক বছরে এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বরং প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছানোর এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, ১২ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিচারপ্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক স্তরেই আটকে আছে।
মামলার আসামি ও বিচার প্রক্রিয়া
সাগর-রুনি হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া আসামির সংখ্যা ৮ জন। এরা হলেন:
- রফিকুল ইসলাম
- বকুল মিয়া
- মাসুম মিন্টু
- কামরুল ইসলাম ওরফে অরুন
- আবু সাঈদ
- পলাশ রুদ্র পাল (বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী)
- এনায়েত আহমেদ (আরেক নিরাপত্তারক্ষী)
- তানভীর রহমান খান (পালাশের বন্ধু)
এই আসামিদের মধ্যে তানভীর ও পলাশ বর্তমানে জামিনে মুক্ত, বাকিরা রয়েছেন কারাগারে আটক অবস্থায়।
সাংবাদিক সমাজের ক্ষোভ ও প্রশ্ন
দীর্ঘ তদন্ত, একের পর এক সংস্থা পরিবর্তন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং অব্যাহত প্রতিবেদন জমা বিলম্ব—সব মিলিয়ে সাংবাদিক সমাজে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। বারবার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, যা শুধু নিহত পরিবার নয়, বরং পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
প্রায় প্রতিবারই প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য হওয়া মানে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের জন্য নতুন করে অপেক্ষা এবং নতুন করে হতাশা। এই প্রেক্ষাপটে বিচারপ্রক্রিয়ায় গতি আনার জন্য সাংবাদিক সমাজ আবারও সরকারের কাছে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাচ্ছে।





eto bochor lagaya ekta investigation kortese hassokor